বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ শহর কুমিল্লা, যার সমৃদ্ধ ইতিহাস ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে, সেই শহরের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা কুমিল্লা বিমানবন্দর।
ব্রিটিশ আমলে স্থাপিত হলেও, কালের পরিক্রমায় এটি আজ একটি অচল অবকাঠামোতে পরিণত হয়েছে।
বর্তমানে বিমানবন্দরটি পুনঃউদ্বোধন ও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা আলোচনায় রয়েছে।
এই প্রবন্ধে কুমিল্লা বিমানবন্দরের ইতিহাস, বর্তমান অবস্থা, উন্নয়ন সম্ভাবনা এবং সম্ভাব্য ব্যয় বিশ্লেষণ তুলে ধরা হলো।
কুমিল্লা বিমানবন্দরের ইতিহাস
কুমিল্লা বিমানবন্দর নির্মিত হয়েছিল ১৯৪০-এর দশকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্সের সামরিক উদ্দেশ্যে।
যুদ্ধের সময় এটি বিমান ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
পাকিস্তান আমলেও এখানে উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক বিমান চলাচল গড়ে ওঠেনি।
স্বাধীনতার পরে এটি বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসে, তবে নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালিত হয়নি।
বর্তমান অবস্থা
বর্তমানে কুমিল্লা বিমানবন্দর কোনো নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইট পরিচালনা করে না।
অবকাঠামো পুরনো এবং অনেকাংশে অব্যবহৃত।
রানওয়ে সচল থাকলেও তা আধুনিক মাপের নয়।
বিমানবন্দরটি কখনো কখনো জরুরি অবতরণ, প্রশিক্ষণ বা বিশেষ ব্যবহারে ব্যবহৃত হয়।
জনগণের দীর্ঘদিনের দাবি—একটি আধুনিক কুমিল্লা বিমানবন্দর গড়ে তোলা।
কুমিল্লা বিমানবন্দর উন্নয়ন: ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
কুমিল্লা বিমানবন্দরের উন্নয়ন হলে এটি হতে পারে:
ঢাকা ও চট্টগ্রামের মধ্যবর্তী একটি বিকল্প বিমান চলাচলের কেন্দ্র।
কুমিল্লা অঞ্চলের শিল্প, ব্যবসা ও পর্যটন উন্নয়নের নতুন দ্বার।
প্রবাসী ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হাব।
দক্ষিণ-পূর্ব বাংলাদেশের সংযোগ বৃদ্ধি এবং সময় ও খরচ কমানোর অন্যতম মাধ্যম।
কেন কুমিল্লা বিমানবন্দরের উন্নয়ন প্রয়োজন?
কুমিল্লা বিভাগ হওয়ার সম্ভাবনার সাথে সাথে আঞ্চলিক অবকাঠামো শক্তিশালী করা দরকার।
কোটবাড়ি, ময়নামতি, শালবন বিহারসহ নানা ঐতিহাসিক স্থান সহজে ভ্রমণের সুবিধা হবে।
আঞ্চলিক ব্যবসা-বাণিজ্য, কারখানা ও অর্থনৈতিক জোনের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
জরুরি অবস্থা বা দুর্যোগকালে বিকল্প বিমানবন্দর হিসেবে ব্যবহারের সুবিধা থাকবে।
কুমিল্লা বিমানবন্দরের উন্নয়নে সম্ভাব্য অবকাঠামোগত কাজসমূহ
রানওয়ে পুনর্গঠন ও সম্প্রসারণ (কমপক্ষে ৬০০০ ফুট দীর্ঘ)।
আধুনিক টার্মিনাল ভবন নির্মাণ (ডমেস্টিক মানের)।
এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (ATC) টাওয়ার ও রাডার স্থাপন।
নিরাপত্তা ইকুইপমেন্ট (স্ক্যানার, সিসিটিভি, সুরক্ষা বেষ্টনী) ইনস্টলেশন।
অ্যাপ্রোন ও ট্যাক্সিওয়ে নির্মাণ।
নতুন যোগাযোগ সড়ক এবং গেটওয়ে উন্নয়ন।
ফায়ার সার্ভিস ও ইমারজেন্সি রেসকিউ সুবিধা স্থাপন।
কুমিল্লা বিমানবন্দরের উন্নয়নের জন্য সম্ভাব্য আনুমানিক ব্যয়
| উন্নয়ন খাত | সম্ভাব্য ব্যয় (বাংলাদেশি টাকা) |
|---|---|
| রানওয়ে পুনর্গঠন ও সম্প্রসারণ | ১৫০–২০০ কোটি টাকা |
| নতুন টার্মিনাল ভবন নির্মাণ | ৫০–৭০ কোটি টাকা |
| এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল (ATC) টাওয়ার ও ইকুইপমেন্ট | ৩০–৫০ কোটি টাকা |
| নিরাপত্তা ও নেভিগেশন সিস্টেম | ২৫–৩৫ কোটি টাকা |
| ট্যাক্সিওয়ে ও অ্যাপ্রোন নির্মাণ | ২০–৩০ কোটি টাকা |
| ইউটিলিটি ইনফ্রাস্ট্রাকচার (বিদ্যুৎ, পানি, সড়ক) | ১৫–২০ কোটি টাকা |
| পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও অন্যান্য সুবিধা | ১০–১৫ কোটি টাকা |
| অন্যান্য ব্যয় ও রিজার্ভ ফান্ড | ২০–২৫ কোটি টাকা |
মোট সম্ভাব্য ব্যয়:
৩২০ কোটি থেকে ৪৫০ কোটি টাকা
(প্রায় ৩০–৪৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আন্তর্জাতিক হিসেবে)
চ্যালেঞ্জ ও করণীয়
চ্যালেঞ্জ:
বিশাল অর্থ বিনিয়োগ প্রয়োজন।
ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের নিকটবর্তী হওয়ায় যাত্রী চাহিদা কম হতে পারে।
সরকারি ও বেসরকারি যৌথ বিনিয়োগ ছাড়া এককভাবে প্রকল্প বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে।
করণীয়:
পর্যটন, ব্যবসা, এবং শিল্পায়নভিত্তিক পরিকল্পনা সাজানো।
প্রাথমিকভাবে ডমেস্টিক ফ্লাইট চালুর মাধ্যমে ধাপে ধাপে সম্প্রসারণ।
প্রাইভেট-পাবলিক পার্টনারশিপ (PPP) মডেলে উন্নয়ন প্রকল্প গঠন।
কুমিল্লা বিমানবন্দর উন্নয়ন বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটাতে পারে।
এটি শুধু কুমিল্লারই নয়, পুরো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সহায়ক হতে পারে।
সঠিক পরিকল্পনা ও টেকসই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কুমিল্লা বিমানবন্দর হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের নতুন আঞ্চলিক বিমান চলাচলের কেন্দ্রবিন্দু।
রেফারেন্স:
বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (CAAB)
স্থানীয় সরকার উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রতিবেদন
Second World War airfield historical archives
সমকালীন সংবাদ প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণ

