গত ১৬ মার্চ, ২০২৬, সোমবার বিকেল ৪টা। আকাশ মেঘলা, হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে মালয়েশিয়ার সেলাঙ্গর প্রদেশের সুবাং জায়ায় (Subang Jaya)। যখন বাংলাদেশে পরিবারগুলো অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে তাদের প্রিয়জনের পাঠানো টাকায় ঈদের কেনাকাটা করবে বলে, ঠিক তখনই ইউএসজে ১৪-এর ‘গুডইয়ার কোর্ট ৮’ (Goodyear Court 8) অ্যাপার্টমেন্টে নেমে এলো এক বিভীষিকা। ক্রেন দিয়ে কাজ করার সময় ৫ তলা থেকে পড়ে গিয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারালেন ৩ জন বাংলাদেশি প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা।
ঘটনার বিবরণ ও নির্মম পরিণতি
প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, নিহত তিন শ্রমিকের বাড়ি বাংলাদেশের নোয়াখালী জেলায়। ঈদের মাত্র তিন দিন বাকি থাকতে এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। মালয়েশিয়ার স্থানীয় সময় বিকেলে বৃষ্টির মধ্যে কাজ করার সময় অসাবধানতাবশত বা যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে তারা উপর থেকে ছিটকে নিচে পড়েন। ঘটনাস্থলে পড়ে থাকা নিথর দেহ আর চাপ চাপ রক্ত বলে দিচ্ছিল, এই শ্রমিকদের আর পরিবারের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করা হলো না।
প্রবাসী মৃত্যু: একটি নীরব মহামারি (পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা)
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জন্য বিদেশের মাটি যেন এক এক করে মৃত্যুফাঁদ হয়ে উঠছে। প্রতি বছর হাজার হাজার প্রবাসী শ্রমিকের নিথর দেহ বিমানবন্দরে নামছে, যা কোনো যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির চেয়ে কম নয়।
ভয়াবহ পরিসংখ্যান (২০২১–২০২৬)
সরকারি এবং বেসরকারি (ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম) তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতি বছর গড়ে ৩,৫০০ থেকে ৪,৫০০ প্রবাসীর মরদেহ বাংলাদেশে ফেরত আসে। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে ১০ থেকে ১২ জন প্রবাসীর স্বপ্ন কফিনে বন্দি হয়ে দেশে ফিরছে।
| বছর | মরদেহ ফেরার সংখ্যা (প্রায়) | গড় প্রতিদিন | প্রধান কারণসমূহ |
| ২০২৩ | ৪,১০০ জন | ১১ জন | স্ট্রোক, হৃদরোগ, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা |
| ২০২৪ | ৪,৫০০ জন | ১২ জন | অতিরিক্ত গরম, কর্মক্ষেত্রে পতন |
| ২০২৫ | ৪,৩০০ জন | ১২ জন | সড়ক দুর্ঘটনা, শ্বাসকষ্ট |
| ২০২৬ (বর্তমান) | ৯০০+ জন (মার্চ পর্যন্ত) | ১০+ জন | কারিগরি ত্রুটি, আবহাওয়া |
মৃত্যুর প্রধান কারণ: স্বাভাবিক নাকি অস্বাভাবিক?
মর্মান্তিক বিষয় হলো, ফিরে আসা মরদেহের প্রায় ৭০% থেকে ৮০% মৃত্যুর কারণ হিসেবে লেখা থাকে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ (হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক)। কিন্তু জনশক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি আদতে ‘স্বাভাবিক’ নয়। এর পেছনে রয়েছে সুগভীর সংকট:
১. হিটস্ট্রোক ও ডিহাইড্রেশন: মধ্যপ্রাচ্য বা মালয়েশিয়ার মতো তীব্র গরমের দেশে বিরতিহীন কাজ এবং পর্যাপ্ত পানি পান না করায় শ্রমিকের শরীরে মারাত্মক চাপ সৃষ্টি হয়।
২. অমানবিক আবাসন: ছোট ঘরে গাদাগাদি করে থাকা এবং পর্যাপ্ত অক্সিজেনের অভাবে ঘুমের মধ্যে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা সবচেয়ে বেশি।
৩. নিরাপত্তার অভাব: মালয়েশিয়ার সুবাং জায়ার মতো নির্মাণ সাইটগুলোতে ক্রেন দুর্ঘটনা বা উচ্চতা থেকে পড়ে যাওয়া একটি নিয়মিত ঘটনা, যা মূলত যান্ত্রিক ত্রুটি এবং সেফটি বেল্টের অভাবের কারণে ঘটে।
৪. মানসিক চাপ: ঋণের বোঝা, পরিবারের চাপ এবং বিদেশের নিঃসঙ্গতা অনেক প্রবাসীকে মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে দেয়, যা স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায়।
আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও বাস্তবতা
একজন প্রবাসী মারা গেলে সরকারিভাবে মরদেহ পরিবহনের জন্য ৩৫,০০০ টাকা এবং পরিবারের জন্য ৩ লক্ষ টাকা অনুদান দেওয়া হয় (ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড)। তবে অনেক ক্ষেত্রে অবৈধভাবে থাকা শ্রমিকরা এই সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন, যা তাদের পরিবারের জন্য দোযখের সমান কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
লাশ প্রেরণে ভোগান্তি: মরদেহের অপেক্ষা যেন শেষ হয় না
একজন প্রবাসী যখন মারা যান, তার মরদেহ দেশে পাঠানো নিয়ে পরিবারের ভোগান্তির শেষ থাকে না। প্রধান বাধাগুলো হলো:
কাগজপত্রের জটিলতা: নিয়োগকারী কোম্পানি, দূতাবাস এবং বিদেশের স্থানীয় পুলিশের অনাপত্তি সনদ সংগ্রহ করতে কয়েক সপ্তাহ লেগে যায়।
আর্থিক সংকট: অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানির বীমা না থাকায় পরিবারকে মোটা অংকের টাকা খরচ করে লাশ আনতে হয়।
হিমাগারে অবহেলা: আইনি প্রক্রিয়া শেষ হতে দেরি হওয়ায় অনেক সময় বিদেশের মর্গে মাসের পর মাস মরদেহ পড়ে থাকে।
সরকারের ভূমিকা ও আমাদের দাবি
প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকলেও, তাদের সুরক্ষায় রাষ্ট্র ও দূতাবাসের ভূমিকা নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে। এই দুর্ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের জোরালো দাবি:
বীমা নিশ্চিতকরণ: প্রতিটি প্রবাসীর জন্য বাধ্যতামূলক এবং কার্যকর জীবন বীমা নিশ্চিত করতে হবে।
নিরাপত্তা তদারকি: মালয়েশিয়াসহ অন্যান্য দেশের নির্মাণ সাইটগুলোতে শ্রমিকদের নিরাপত্তা সরঞ্জাম (যেমন- হার্নেস, হেলমেট) ব্যবহারের ওপর দূতাবাসের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
দ্রুত মরদেহ প্রত্যাবাসন: প্রবাসীর মৃত্যুর ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মরদেহ দেশে পাঠানোর জন্য একটি ‘স্পেশাল সেল’ গঠন করতে হবে।
পরিবারকে পুনর্বাসন: যারা কর্মক্ষেত্রে প্রাণ হারাচ্ছেন, তাদের অসহায় পরিবারকে এককালীন আর্থিক সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
সুবাং জায়ার এই তিন শ্রমিকের রক্তে ভেজা মাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রবাস জীবন শুধু টাকার খনি নয়, এটি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খেলা করা এক সংগ্রাম। নোয়াখালীর সেই তিনটি পরিবারে আজ ঈদের চাঁদ উঠবে না, উঠবে কান্নার রোল। আমরা কি পারিনা এই রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের জন্য অন্তত একটি নিরাপদ কর্মক্ষেত্র নিশ্চিত করতে?
রাষ্ট্রের কাছে আমাদের আহ্বান, প্রবাসী ভাইদের লাশ যেন এভাবে বিদেশের পিচঢালা রাস্তায় অবহেলিত পড়ে না থাকে। তাদের সম্মান ও সুরক্ষা নিশ্চিত করাই হোক এবারের ঈদের অঙ্গীকার।

