ঈমানের ৭৭টি শাখা কী? সহিহ হাদিসের আলোকে পূর্ণ বিশ্লেষণ

ঈমান: শুধু বিশ্বাস নয়-অন্তর, কথা ও কর্মের পূর্ণাঙ্গ সমন্বয়

বর্তমান সময়ে “ঈমান” শব্দটি খুব সহজে উচ্চারিত হলেও এর গভীরতা ও ব্যাপ্তি অনেকের কাছেই অস্পষ্ট। অনেকেই ঈমানকে শুধু অন্তরের বিশ্বাস মনে করেন। অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে ঈমান হলো—অন্তরের বিশ্বাস, জিহ্বার স্বীকারোক্তি এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের বাস্তব আমলের সমন্বিত রূপ

এই সত্যটি সবচেয়ে সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে ঈমানের শাখাসমূহ সংক্রান্ত হাদিসে। এই আর্টিকেলে আমরা জানব—

  • ঈমানের শাখা বলতে কী বোঝায়

  • ৭৭টি শাখা কোথা থেকে এসেছে

  • প্রতিটি শাখার অর্থ ও বাস্তব গুরুত্ব

  • কেন লজ্জা (হায়া) আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে


ঈমানের শাখা সম্পর্কিত মূল হাদিস

আবু হুরাইরা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

“ঈমানের সত্তরেরও বেশি (অন্য বর্ণনায় ষাটেরও বেশি) শাখা রয়েছে। তার সর্বোচ্চ শাখা হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলা, সর্বনিম্ন শাখা হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানো। আর লজ্জা (হায়া) ঈমানের একটি শাখা।”

📖 রেফারেন্স: সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩৫
এছাড়াও বর্ণিত হয়েছে সহিহ বুখারি ও অন্যান্য গ্রন্থে।


ঈমানের ৭৭টি শাখার উৎস

এই হাদিসে সব শাখা একত্রে তালিকাভুক্ত করা হয়নি। পরবর্তীতে বিশিষ্ট মুহাদ্দিস ইমাম আবু বকর আল-বাইহাকি (রহ.) কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে ঈমানের শাখাগুলো সংকলন করেন তাঁর বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ—

📘 শু‘আবুল ঈমান

তিনি সেখানে ঈমানের ৭৭টি শাখা সুসংগঠিতভাবে উপস্থাপন করেন, যা উম্মাহর আলিমদের কাছে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য।


ঈমানের ৭৭টি শাখা

ইমাম বাইহাকি (রহ.) ঈমানের শাখাগুলোকে তিন ভাগে বিভক্ত করেছেন—

প্রথম বিভাগ: অন্তরের আমল (৩০টি)

১. আল্লাহ তাআলার প্রতি ঈমান
২. ফেরেশতাদের প্রতি ঈমান
৩. আসমানী কিতাবসমূহে ঈমান
৪. সকল নবী-রাসূলের প্রতি ঈমান
৫. আখিরাতের প্রতি ঈমান
৬. তাকদীরের ভাল-মন্দে ঈমান
৭. আল্লাহকে ভালোবাসা
৮. আল্লাহর জন্য ভালোবাসা ও শত্রুতা
৯. আল্লাহকে ভয় করা (খাওফ)
১০. আল্লাহর রহমতের আশা রাখা (রজা)
১১. আল্লাহর উপর পূর্ণ ভরসা (তাওয়াক্কুল)
১২. ইখলাস বা নিয়ত বিশুদ্ধ করা
১৩. তাওবা করা
১৪. ধৈর্য ধারণ করা (সবর)
১৫. আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা (রিদা)
১৬. আল্লাহর নেয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
১৭. লজ্জা (হায়া)
১৮. বিনয় ও নম্রতা (তাওয়াদু)
১৯. অহংকার ত্যাগ
২০. হিংসা ত্যাগ
২১. বিদ্বেষ ও শত্রুতা ত্যাগ
২২. ক্রোধ সংযম করা
২৩. প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি পরিত্যাগ
২৪. দুনিয়ার অতিরিক্ত মোহ ত্যাগ
২৫. আল্লাহর স্মরণে অন্তর জাগ্রত রাখা
২৬. মৃত্যু স্মরণ করা
২৭. পাপকে ঘৃণা করা
২৮. কুফর ও শিরককে ঘৃণা করা
২৯. আল্লাহর রহমতে দৃঢ় বিশ্বাস
৩০. গুনাহে লিপ্ত হয়ে আনন্দ না পাওয়া

এই ৩০টি শাখাই ঈমানের ভিত্তি। অন্তর ঠিক না হলে বাহ্যিক আমল গ্রহণযোগ্য হয় না।

দ্বিতীয় বিভাগ: জিহ্বার আমল (৭টি)

৩১. কালিমা শাহাদাহ পাঠ
৩২. কুরআন তিলাওয়াত
৩৩. আল্লাহর যিকির করা
৩৪. দোয়া করা
৩৫. দ্বীনি জ্ঞান শিক্ষা দেওয়া
৩৬. সৎ কাজের আদেশ দেওয়া
৩৭. অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করা

জিহ্বা সঠিক না হলে অন্তরের ঈমান দুর্বল হয়ে পড়ে।

তৃতীয় বিভাগ: অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের আমল (৪০টি)

৩৮. পবিত্রতা অর্জন (ওযু, গোসল)
৩৯. সালাত কায়েম করা
৪০. যাকাত আদায়
৪১. সিয়াম পালন
৪২. হজ আদায়
৪৩. উমরা পালন
৪৪. ইতিকাফ করা
৪৫. দ্বীনের জন্য হিজরত
৪৬. প্রতিশ্রুতি রক্ষা
৪৭. আমানত আদায়
৪৮. পিতা-মাতার খিদমত
৪৯. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা
৫০. প্রতিবেশীর হক আদায়
৫১. অতিথি সম্মান করা
৫২. মুসলিমদের প্রতি দয়া করা
৫৩. শিশুদের প্রতি স্নেহ
৫৪. বড়দের সম্মান
৫৫. ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা
৫৬. সালামের প্রসার
৫৭. অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া
৫৮. জানাজায় অংশগ্রহণ
৫৯. মৃতকে দাফন করা
৬০. মিথ্যা পরিত্যাগ
৬১. সুদ বর্জন
৬২. ঘুষ বর্জন
৬৩. জুলুম ত্যাগ
৬৪. অশ্লীলতা পরিত্যাগ
৬৫. পর্দা রক্ষা
৬৬. দৃষ্টি সংযত রাখা
৬৭. লজ্জাস্থান হেফাজত
৬৮. হারাম খাদ্য বর্জন
৬৯. হালাল উপার্জন
৭০. অপচয় ত্যাগ
৭১. কৃপণতা পরিত্যাগ
৭২. ক্ষমা করা
৭৩. মানুষের উপকার করা
৭৪. রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানো
৭৫. শান্তি বজায় রাখা
৭৬. ফিতনা থেকে দূরে থাকা
৭৭. মুসলিম উম্মাহর ঐক্য রক্ষা

লজ্জা (হায়া) কেন বিশেষভাবে উল্লেখিত?

কারণ লজ্জা—

  • অন্তরের ঈমানের প্রহরী

  • গোপন ও প্রকাশ্য উভয় গুনাহ থেকে রক্ষা করে

  • চরিত্র ও সমাজকে শুদ্ধ রাখে

রাসূল ﷺ বলেছেন—

“লজ্জা ঈমানের অংশ।”

📖 রেফারেন্স: সহিহ বুখারি

ঈমান কোনো তাত্ত্বিক ধারণা নয়—
এটি বিশ্বাস, কথা ও কাজের সমন্বিত জীবনব্যবস্থা
যে ঈমান অন্তরে নেই, কথায় নেই, কাজে নেই—তা কেবল নামমাত্র।

ঈমান বাড়ে আমলে, কমে গুনাহে।

রেফারেন্স

  • সহিহ মুসলিম

  • সহিহ বুখারি

  • শু‘আবুল ঈমান

  • রিয়াদুস সালিহিন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *