বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ, আত্মত্যাগ, বীরত্ব ও বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মানের ইতিহাস
কেন আজ আবার বীরশ্রেষ্ঠদের কথা বলা জরুরি
একটি জাতির ভবিষ্যৎ কেবল অর্থনীতি বা প্রযুক্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। ভবিষ্যৎ দাঁড়িয়ে থাকে স্মৃতির ওপর—কে আমরা ছিলাম, কীভাবে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, আর সেই স্বাধীনতার মূল্য কতটা রক্তে লেখা। যখনই সমাজে অস্থিরতা তৈরি হয়, যখন তরুণদের মৃত্যু আমাদের বিবেক নাড়িয়ে দেয়, তখনই আবার প্রশ্ন ওঠে—আমরা কি আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ঠিকভাবে মনে রাখছি?
এই প্রেক্ষাপটে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক নূর মোহাম্মদ শেখ–এর জীবন ও আত্মত্যাগ নতুন করে স্মরণ করা শুধু ইতিহাস চর্চা নয়, এটি দেশপ্রেমকে জীবিত রাখার একটি দায়িত্ব।
বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ: সংক্ষিপ্ত পরিচয়
বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখ জন্মগ্রহণ করেন তৎকালীন যশোর জেলার (বর্তমান নড়াইল জেলা) এক সাধারণ গ্রামীণ পরিবারে। সাধারণ পরিবারে জন্ম হলেও তাঁর জীবন ছিল অসাধারণ সাহস ও কর্তব্যবোধের উদাহরণ। কৈশোর থেকেই শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেমের প্রতি ঝোঁক তাঁকে পাকিস্তান রাইফেলস (বর্তমান বিজিবি)–এ যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করে।
তিনি ছিলেন একজন ল্যান্স নায়েক—অর্থাৎ নিচু পদে থেকেও দায়িত্ব পালনে ছিলেন আপসহীন। মুক্তিযুদ্ধের সময় এমন অসংখ্য সাধারণ সৈনিকই ছিলেন প্রকৃত অর্থে স্বাধীনতার স্তম্ভ।
মুক্তিযুদ্ধে নূর মোহাম্মদ শেখের ভূমিকা
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে নূর মোহাম্মদ শেখ দায়িত্ব পালন করছিলেন সীমান্তবর্তী এলাকায়। এই সময় তাঁর ওপর যে দায়িত্ব পড়ে, তা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ—শত্রু বাহিনীর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ, প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং সহযোদ্ধাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
তিনি এমন এক পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করছিলেন, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত মানেই ছিল জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণ। তবুও দায়িত্বের প্রশ্নে তিনি কখনো পিছু হটার কথা ভাবেননি। কারণ তাঁর কাছে যুদ্ধ মানে শুধু অস্ত্রের লড়াই নয়, এটি ছিল নিজের দেশের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
যেভাবে তিনি শহীদ হন: আত্মত্যাগের চূড়ান্ত উদাহরণ
১৯৭১ সালের ৫ সেপ্টেম্বর, যশোরের গোয়ালহাটির কাছে এক ভয়াবহ সংঘর্ষে নূর মোহাম্মদ শেখ সম্মুখসমরে অবতীর্ণ হন। শত্রু বাহিনীর শক্ত অবস্থানের মুখে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন—যদি এই মুহূর্তে প্রতিরোধ গড়ে না তোলা যায়, তাহলে তাঁর সহযোদ্ধারা বড় বিপদের মুখে পড়বে।
এই অবস্থায় তিনি নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সামনে এগিয়ে যান। তাঁর লক্ষ্য ছিল একটাই—সহযোদ্ধাদের নিরাপদে সরে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। শত্রুর গুলিতে গুরুতর আহত হওয়ার পরও তিনি অবস্থান ছাড়েননি। শেষ পর্যন্ত তিনি শহীদ হন, কিন্তু তাঁর আত্মত্যাগের বিনিময়ে অন্য মুক্তিযোদ্ধারা প্রাণে বেঁচে যান।
এই ঘটনাটি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়—কখনো কখনো একজন মানুষের সাহসই বহু মানুষের জীবন বাঁচায়।
“বীরশ্রেষ্ঠ” উপাধি: অর্থ ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্ব
বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্ব প্রদর্শনের জন্য চার ধরনের বীরত্বসূচক উপাধি প্রবর্তন করে—
বীরশ্রেষ্ঠ (সর্বোচ্চ)
বীর উত্তম
বীর বিক্রম
বীর প্রতীক
“বীরশ্রেষ্ঠ” হলো বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বীরত্বসূচক সম্মান। এই উপাধি দেওয়া হয় এমন বীরদের, যাঁরা দেশের জন্য সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ করেছেন এবং যাঁদের সাহসিকতা ছিল ব্যতিক্রমী ও অনন্য।
নূর মোহাম্মদ শেখকে এই উপাধিতে ভূষিত করা হয় তাঁর অসীম সাহস, কর্তব্যনিষ্ঠা এবং আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে।
বাংলাদেশের বীরশ্রেষ্ঠ কারা ছিলেন
বাংলাদেশের ইতিহাসে মোট সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ আছেন। তাঁরা হলেন—
বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর
বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান
বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ রুহুল আমিন
বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মোস্তফা কামাল
বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ হামিদুর রহমান
বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মুন্সী আবদুর রউফ
বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ নূর মোহাম্মদ শেখ
এই সাতজনই স্বাধীনতার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তাঁদের জীবনের গল্প শুধু অতীত নয়, এটি ভবিষ্যতের জন্য নৈতিক দিকনির্দেশনা।
আজকের প্রজন্মের জন্য নূর মোহাম্মদ শেখের শিক্ষা
আজকের তরুণ সমাজ অনেক প্রশ্নের মুখোমুখি। দেশপ্রেম কি শুধু স্লোগানে সীমাবদ্ধ? নাকি দেশপ্রেম মানে দায়িত্ব, সততা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো?
নূর মোহাম্মদ শেখের জীবন আমাদের শেখায়—দেশপ্রেম মানে নিজের সুবিধার কথা না ভেবে বৃহত্তর স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়া। তিনি কোনো বড় পদে ছিলেন না, কোনো ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন না। তবুও তাঁর সিদ্ধান্ত ও আত্মত্যাগ তাঁকে ইতিহাসের সর্বোচ্চ আসনে বসিয়েছে।
দেশপ্রেম বাঁচিয়ে রাখার দায় আমাদের
একটি জাতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন সে তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ভুলে যায় না। বীরশ্রেষ্ঠ নূর মোহাম্মদ শেখের আত্মত্যাগ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা কোনো স্বাভাবিক বিষয় নয়, এটি রক্তের বিনিময়ে অর্জিত।
আজ যখন আমরা নতুন প্রজন্মের হাতে দেশ তুলে দিতে চাই, তখন এই ইতিহাস জানানো আমাদের দায়িত্ব। কারণ ইতিহাস জানা মানেই অতীতে আটকে থাকা নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য সঠিক পথ বেছে নেওয়া।

