কেন ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরকে জানা জরুরি
বাংলাদেশের স্বাধীনতা কেবল একটি রাজনৈতিক অর্জন নয়, এটি অসংখ্য ত্যাগ, বেদনাবিধুর গল্প এবং আত্মোৎসর্গের ইতিহাস। এই ইতিহাসের পাতায় এমন কিছু নাম আছে, যাঁদের জীবন শুধু অতীতের স্মৃতি নয়—বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য নৈতিক দিকনির্দেশনা।
বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর ঠিক তেমনই একজন মানুষ।
তিনি ছিলেন একজন প্রশিক্ষিত সেনা কর্মকর্তা, একজন সাহসী কমান্ডার এবং সর্বোপরি একজন দায়িত্বশীল দেশপ্রেমিক। তাঁর জীবন ও আত্মত্যাগ বুঝতে পারলে আমরা বুঝতে পারি—দেশপ্রেম মানে কেবল আবেগ নয়, এটি দায়িত্ব ও সিদ্ধান্তের প্রশ্ন।
ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর: সংক্ষিপ্ত পরিচয়
ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৯ সালে, তৎকালীন যশোর জেলায়। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন শৃঙ্খলাপরায়ণ ও দায়িত্বশীল। পড়াশোনা শেষ করে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে, অনেক বাঙালি সেনা কর্মকর্তার মতো তিনিও দ্বিধাহীনভাবে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। তাঁর কাছে এটি ছিল পেশাগত দায়িত্বের চেয়েও বড়—নিজের জাতি ও দেশের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন।
মুক্তিযুদ্ধে তাঁর দায়িত্ব ও নেতৃত্ব
মুক্তিযুদ্ধের সময় ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর দায়িত্ব পালন করছিলেন পশ্চিমাঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্রন্টে। এই এলাকা ছিল কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখান দিয়ে শত্রু বাহিনীর চলাচল ও সরবরাহ ব্যবস্থা পরিচালিত হতো।
একজন ক্যাপ্টেন হিসেবে তাঁর দায়িত্ব ছিল শুধু যুদ্ধ করা নয়—মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করা, আক্রমণের পরিকল্পনা করা এবং প্রয়োজন হলে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া। তাঁর নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল—তিনি কখনো সহযোদ্ধাদের পেছনে রেখে নিজে নিরাপদে থাকেননি। সব সময় তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
যে সিদ্ধান্ত তাঁকে ইতিহাসে অমর করেছে
১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর। মুক্তিযুদ্ধের একেবারে শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ। এই সময় চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর একটি শক্ত অবস্থান ভাঙার প্রয়োজন দেখা দেয়। এই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর।
পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। শত্রু বাহিনী নদীর ওপারে শক্ত প্রতিরক্ষা গড়ে তুলেছিল। অনেকেই তখন অপেক্ষা করতে চেয়েছিলেন আরও শক্তিশালী প্রস্তুতির জন্য। কিন্তু ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর বুঝতে পেরেছিলেন—এই মুহূর্তে আঘাত হানতে না পারলে শত্রু আরও সংগঠিত হওয়ার সুযোগ পাবে।
তিনি নিজেই সামনে এগিয়ে যান, নদী পার হয়ে শত্রুর অবস্থানের দিকে অগ্রসর হন। এই সিদ্ধান্ত ছিল ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু তাঁর বিশ্বাস ছিল—একজন কমান্ডার যদি সামনে না থাকেন, তাহলে সেনাদের মনোবল ধরে রাখা কঠিন।
শহীদ হওয়ার মুহূর্ত: দায়িত্বের শেষ সীমা
শত্রু অবস্থানের খুব কাছাকাছি পৌঁছানোর পর ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর শত্রুর গুলিতে গুরুতর আহত হন। তবুও তিনি পিছু হটার চেষ্টা করেননি। তাঁর এই অগ্রযাত্রাই মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য পথ তৈরি করে দেয়।
অবশেষে তিনি শহীদ হন। কিন্তু তাঁর আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত সেই অভিযানের ফলেই চাঁপাইনবাবগঞ্জ অঞ্চল শত্রুমুক্ত হয়, এবং স্বাধীনতার পথে আরেকটি বড় বাধা দূর হয়।
তিনি শহীদ হন ঠিক স্বাধীনতার আগের দিন—১৪ ডিসেম্বর। এই সময়টি তাঁর আত্মত্যাগকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।
“বীরশ্রেষ্ঠ” উপাধি: কেন এই সর্বোচ্চ সম্মান
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের স্বীকৃতি হিসেবে চার ধরনের বীরত্বসূচক উপাধি প্রবর্তন করে। এর মধ্যে “বীরশ্রেষ্ঠ” হলো সর্বোচ্চ।
ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরকে বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করা হয় কারণ—
তিনি ছিলেন একজন প্রশিক্ষিত সেনা কর্মকর্তা হয়েও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কথা ভাবেননি
তিনি সম্মুখসমরে নেতৃত্ব দিয়েছেন
তাঁর আত্মত্যাগ সরাসরি যুদ্ধের গতিপথ পরিবর্তনে ভূমিকা রেখেছে
তিনি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেছেন
এই উপাধি কেবল একটি সম্মান নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি যে তাঁর আত্মত্যাগ ছিল ব্যতিক্রমী ও অনন্য।
বাংলাদেশের সাতজন বীরশ্রেষ্ঠের একজন
বাংলাদেশের ইতিহাসে মোট সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ আছেন। ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর তাঁদের মধ্যে একজন। এই সাতজনের প্রত্যেকেই ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে, ভিন্ন ভিন্ন দায়িত্বে জীবন দিয়েছেন—কিন্তু তাঁদের লক্ষ্য ছিল একটাই: স্বাধীন বাংলাদেশ।
ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের বিশেষত্ব ছিল তাঁর নেতৃত্ব। তিনি দেখিয়েছেন, একজন কমান্ডার কেবল আদেশ দেন না—প্রয়োজনে নিজেই সামনে দাঁড়ান।
আজকের প্রজন্মের জন্য তাঁর আত্মত্যাগের শিক্ষা
আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে অনেক তরুণ প্রশ্ন করে—দেশপ্রেম আসলে কী?
ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের জীবন আমাদের একটি স্পষ্ট উত্তর দেয়।
দেশপ্রেম মানে কেবল কথা বলা নয়।
দেশপ্রেম মানে দায়িত্ব নেওয়া, কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রয়োজনে ব্যক্তিগত স্বার্থকে পেছনে রাখা।
তিনি জানতেন তাঁর সিদ্ধান্ত তাঁকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যেতে পারে। তবুও তিনি দায়িত্ব থেকে সরে যাননি। এই মনোবলই তাঁকে ইতিহাসে অমর করেছে।
স্মরণ মানেই দায়িত্ব পালন
বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের জীবন আমাদের শেখায়—একটি জাতি তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের ভুলে গেলে পথ হারায়। তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু ফুল দেওয়া বা দিবস পালন নয়। তাঁকে স্মরণ করা মানে তাঁর আদর্শ থেকে শিক্ষা নেওয়া।
স্বাধীনতা রক্ষা করার দায়িত্ব আজ আমাদের। আর সেই দায়িত্ব পালনের প্রথম ধাপ হলো—ইতিহাস জানা, আত্মত্যাগকে সম্মান করা এবং দেশপ্রেমকে জীবন্ত রাখা।

