পুণ্যভূমি, চায়ের দেশ এবং প্রবাসী আয়ের প্রধান উৎস
সিলেট বিভাগ বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি ঐতিহ্যবাহী এবং অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত সমৃদ্ধ প্রশাসনিক বিভাগ। হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরান (রহ.)-সহ ৩৬০ আউলিয়ার স্মৃতিবিজড়িত এই পুণ্যভূমি কেবল ধর্মীয় কারণেই নয়, বরং তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং অফুরন্ত খনিজ সম্পদের জন্যও বিশ্বখ্যাত। চা বাগান, হাওর এবং পাহাড়ী ঝরনাবেষ্টিত এই অঞ্চলটি বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। সেই সাথে এ অঞ্চলের প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স জাতীয় অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এক বিশাল ভূমিকা পালন করে।
রাষ্ট্র গঠন ও ঐতিহাসিক পটভূমি
সিলেটের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। এটি এককালে কামরূপ ও হরিকেল জনপদের অংশ ছিল। সুফি সাধকদের আগমন এই অঞ্চলের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে আমূল পরিবর্তন আনে।
সংক্ষিপ্ত ঐতিহাসিক ধারা
| সময়কাল | গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা |
| প্রাচীন ও মধ্যযুগ | প্রাচীন হরিকেল ও গৌড় রাজ্যের অংশ। |
| ১৩০৩ | হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর সিলেট বিজয় ও ইসলাম প্রচারের সূচনা। |
| ১৮৭৪ | সিলেটকে আসামের সাথে যুক্ত করা হয়। |
| ১৯৪৭ | ঐতিহাসিক রেফারেন্ডাম বা গণভোটের মাধ্যমে সিলেটের পূর্ব পাকিস্তানে যোগদান। |
| ১৯৯৫ | বাংলাদেশের ষষ্ঠ প্রশাসনিক বিভাগ হিসেবে সিলেটের আত্মপ্রকাশ। |
| ১৯৭১ | মহান মুক্তিযুদ্ধে ৪ ও ৫ নম্বর সেক্টরের অধীনে প্রতিরোধ এবং এম.এ.জি ওসমানীর নেতৃত্ব। |
| বর্তমান (২০২৬) | ডিজিটাল অবকাঠামো ও পর্যটন শিল্পের আধুনিকায়নের মাধ্যমে বৈশ্বিক পরিচিতি। |
সিলেট বিভাগের ইতিহাস মূলত আধ্যাত্মিক চেতনা, বীরত্ব এবং প্রবাসীদের সংগ্রামের ইতিহাস।
মৌলিক বিভাগীয় তথ্য
| বিভাগ | তথ্য |
| বিভাগীয় সদরদপ্তর | সিলেট শহর |
| জেলার সংখ্যা | ৪টি |
| আয়তন | ১২,৫৯৫ বর্গকিলোমিটার |
| জনসংখ্যা (২০২৬ আনু.) | প্রায় ১২.৫ মিলিয়ন (১ কোটি ২৫ লক্ষ) |
| প্রধান নদীসমূহ | সুরমা, কুশিয়ারা, মনু, খোয়াই ও পিয়াইন |
| সিটি কর্পোরেশন | ১টি (সিলেট সিটি কর্পোরেশন) |
| বিশেষ পরিচয় | আধ্যাত্মিক রাজধানী ও চায়ের দেশ |
সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থা
সিলেট বিভাগ কেন্দ্রীয় প্রশাসনের অধীনে থেকে আধ্যাত্মিক ও প্রবাসী গুরুত্ব বিবেচনায় বিশেষ তদারকির মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
| পদ | বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি/সংস্থা |
| বিভাগীয় কমিশনার | অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার সিনিয়র প্রশাসনিক কর্মকর্তা |
| ডিআইজি (Range Police) | সিলেট রেঞ্জের আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা প্রধান |
| মেয়র/প্রশাসক | সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী |
| এসডিএ (SDA) | সিলেট উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (পরিকল্পিত নগরায়নের জন্য) |
প্রশাসনিক কাঠামো
সিলেট বিভাগ ৪টি প্রশাসনিক জেলা নিয়ে গঠিত, যা উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের প্রশাসনিক ভিত্তি:
জেলাসমূহ : ৪টি
উপজেলা: ৪০টি।
পৌরসভা: ২০টি।
ইউনিয়ন পরিষদ: ৩৩০-এর বেশি।
সিলেট বিভাগের জেলা সমূহ
সিলেট বিভাগের অন্তর্গত ৪টি জেলা:
স্থানীয় সরকার কাঠামো
বিভাগীয় কমিশনার → বিভাগের প্রশাসন ও উন্নয়ন প্রকল্পের প্রধান সমন্বয়কারী।
জেলা প্রশাসক (ডিসি) → ৪টি জেলার রাজস্ব ও সাধারণ প্রশাসনের প্রধান।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) → তৃণমূল পর্যায়ের প্রশাসনিক কেন্দ্রবিন্দু।
সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভা → নগর এলাকার নাগরিক সেবা ও আধুনিকায়ন।
আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা
আন্তর্জাতিক সীমান্ত এবং পর্যটন এলাকা হওয়ার কারণে এখানে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিদ্যমান:
| সংস্থা | দায়িত্ব |
| এসএমপি (SMP) | সিলেট মহানগরীর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা |
| সিলেট রেঞ্জ পুলিশ | বিভাগের জেলাসমূহের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা |
| বিজিবি (BGB) | ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সুরক্ষা (সিলেট ও সুনামগঞ্জ সীমান্ত) |
| ট্যুরিস্ট পুলিশ | পর্যটন কেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা ও পর্যটকদের সহায়তা |
| র্যাব (RAB-৯) | মাদক নির্মূল ও সন্ত্রাস দমন |
ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশ
অবস্থান: বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল।
সীমানা: উত্তরে ভারতের মেঘালয়, দক্ষিণে ত্রিপুরা, পূর্বে আসাম এবং পশ্চিমে ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগ।
ভূ-প্রকৃতি: পাহাড়, টিলা, হাওর ও নদ-নদী সমৃদ্ধ বৈচিত্র্যময় অঞ্চল।
বিশেষত্ব: বাংলাদেশের সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয় সিলেটের লালাখালে। এ অঞ্চলের চা বাগানগুলো এক অনন্য ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য।
জলবায়ু: ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ু; তবে প্রচুর বৃষ্টিপাত ও সহনীয় আবহাওয়ার জন্য পরিচিত।
ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতি
| বিভাগ | তথ্য |
| প্রধান ধর্ম | ইসলাম, হিন্দু, খ্রিস্টান ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের নিজস্ব ধর্ম |
| ভাষা | বাংলা (সিলেটী উপভাষার ব্যাপক জনপ্রিয়তা ও স্বকীয়তা) |
| সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য | মরমী সঙ্গীত (হাছন রাজা, শাহ আব্দুল করিম), ধামাইল গান ও মণিপুরী নাচ |
| উৎসব | ঈদ, পূজা, ওরস মোবারক, পহেলা বৈশাখ ও রাস পূর্ণিমা |
অর্থনীতি ও প্রধান খাত
সিলেট বিভাগ জাতীয় জিডিপিতে রেমিট্যান্স ও খনিজ সম্পদের মাধ্যমে বিশাল অবদান রাখে।
| খাত | বিবরণ |
| প্রবাসী আয় | দেশের রেমিট্যান্সের অন্যতম প্রধান উৎস (লন্ডনী সংস্কৃতি)। |
| চা শিল্প | দেশের মোট চায়ের ৯০ শতাংশের বেশি সিলেটে উৎপাদিত হয়। |
| প্রাকৃতিক গ্যাস | দেশের প্রধান প্রধান গ্যাস ফিল্ডের অবস্থান (হরিপুর, বিবিয়ানা)। |
| পর্যটন | দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ। |
| পাথর ও চুনাপাথর | সুনামগঞ্জের ভোলাগঞ্জ ও জাফলং থেকে বিপুল পরিমাণ পাথর আহরণ। |
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য
| বিভাগ | তথ্য |
| সাক্ষরতা | প্রায় ৭৪% (উর্ধমুখী) |
| শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় | শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (SUST), সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (SAU) |
| মেডিকেল প্রতিষ্ঠান | সিলেট এম.এ.জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ (SOMCH) |
| বেসরকারি শিক্ষা | বিপুল সংখ্যক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক স্কুল |
| গড় আয়ু | ৭৩ বছরের উপরে |
যোগাযোগ ও অবকাঠামো
আকাশপথ: ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (সিলেট)—দেশের ৩য় আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
রেলপথ: ঢাকা-সিলেট ও চট্টগ্রাম-সিলেট উন্নত রেল যোগাযোগ।
সড়কপথ: ঢাকা-সিলেট সিক্স লেন এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্প (বাস্তবায়নাধীন)।
স্থলবন্দর: তামাবিল, শেওলা ও সুতারকান্দি স্থলবন্দর।
পর্যটন ও ঐতিহ্য
আধ্যাত্মিক স্থান: হজরত শাহজালাল (রহ.) ও শাহপরান (রহ.)-এর মাজার।
প্রকৃতি: রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট, জাফলং, বিছনাকান্দি ও পান্তুমাই।
চা বাগান: মালনিছড়া (দেশের প্রথম চা বাগান), লাক্কাতুরা ও চা গবেষণা ইনস্টিটিউট।
হাওর: টাঙ্গুয়ার হাওর (সুনামগঞ্জ)—বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ (Ramsar Site)।
স্থাপত্য: কীন ব্রিজ, আলী আমজাদের ঘড়ি ও শাহী ঈদগাহ।
আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ভূমিকা
| বিষয় | বিবরণ |
| প্রবাসী কানেকশন | যুক্তরাজ্য ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত প্রবাসীদের মাধ্যমে বৈশ্বিক প্রভাব। |
| তামাবিল স্থলবন্দর | ভারতের সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলোর সাথে বাণিজ্যের প্রধান গেটওয়ে। |
| বিদ্যুৎ উৎপাদন | প্রাকৃতিক গ্যাসের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ সরবরাহ। |
| সাংস্কৃতিক বিনিময় | মণিপুরী সম্প্রদায়ের মাধ্যমে ভারত-বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধন। |
সারসংক্ষেপ
সিলেট বিভাগ বাংলাদেশের এক গর্বিত জনপদ। চায়ের সবুজ গালিচা আর আধ্যাত্মিকতার নূর এই অঞ্চলকে অনন্য করে তুলেছে। প্রবাসীদের শ্রমের ফসল আর মাটির তলার গ্যাস সম্পদ জাতীয় অর্থনীতির মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী করছে। ২০২৬ সালের এই সময়ে সিলেট বিভাগ তার প্রাকৃতিক সম্পদকে কাজে লাগিয়ে স্মার্ট ট্যুরিজম ও আধুনিক শিল্পায়নের পথে এক ধাপ এগিয়ে রয়েছে।
নিউজ ও আর্টিকেল
স্মার্ট ট্যুরিজম সিলেট ২০২৬: আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও ডিজিটাল গাইডের মাধ্যমে পর্যটন উন্নয়ন।
টাঙ্গুয়ার হাওর সংরক্ষণ: জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পরিবেশ অধিদপ্তরের বিশেষ পদক্ষেপ।
রেমিট্যান্স প্রবাহে নতুন রেকর্ড: লন্ডন ও ইউরোপ থেকে সিলেটে প্রবাসী আয়ের উর্ধগতি।
আমাদের লক্ষ্য
AFP Global Knowledge Hub–এ আমাদের লক্ষ্য হলো সিলেট বিভাগের আধ্যাত্মিক ইতিহাস, প্রাকৃতিক সম্পদ এবং বৈশ্বিক গুরুত্ব বিশ্বের কাছে তুলে ধরা। আমরা তথ্যের স্বচ্ছতা বজায় রেখে এই অঞ্চলের সামগ্রিক প্রোফাইল প্রদান করি।
যোগাযোগ করুন
📧 shababalsharif@gmail.com
ধন্যবাদ!
আপনি এখন বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্ত জানার যাত্রায় আছেন – আমাদের সাথেই থাকুন!
