সুন্দরবনের প্রবেশদ্বার এবং বাংলাদেশের শিল্প ও নীল অর্থনীতির কেন্দ্র
খুলনা বিভাগ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বিভাগ। এটি বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন ‘সুন্দরবন’ এবং দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর ‘মোংলা’-এর জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত। শিল্প, বাণিজ্য এবং মৎস্য সম্পদে সমৃদ্ধ এই বিভাগটি বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ‘হোয়াইট গোল্ড’ বা চিংড়ি রপ্তানির মাধ্যমে বিশাল অবদান রাখে। ভৌগোলিক বৈচিত্র্য এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রবেশদ্বার হিসেবে খুলনা বিভাগ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম কৌশলগত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।
রাষ্ট্র গঠন ও ঐতিহাসিক পটভূমি
খুলনা বিভাগের ইতিহাস প্রাচীন সমতট ও বঙ্গ জনপদের ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। মধ্যযুগে হজরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর আগমন এই অঞ্চলের স্থাপত্য ও সংস্কৃতিতে আমূল পরিবর্তন আনে।
সংক্ষিপ্ত ঐতিহাসিক ধারা
| সময়কাল | গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা |
| প্রাচীন ও মধ্যযুগ | সমতট অঞ্চলের অংশ এবং ১২০৪ সালের পর মুসলিম শাসনের বিস্তার। |
| ১৫শ শতক | হজরত খান জাহান আলী (রহ.) কর্তৃক খলিফাতাবাদ নগর (বাগেরহাট) প্রতিষ্ঠা। |
| ১৯৬০ | প্রশাসনিক বিভাগ হিসেবে খুলনার আত্মপ্রকাশ। |
| ১৯৭১ | মহান মুক্তিযুদ্ধে ৮ ও ৯ নম্বর সেক্টরের অধীনে প্রতিরোধ এবং মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠন। |
| ২০২৪ | ছাত্র-জনতার বিপ্লব পরবর্তী সময়ে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও শিল্প পুনর্গঠন কার্যক্রম। |
| বর্তমান (২০২৬) | পদ্মা সেতু ও মোংলা বন্দরের আধুনিকায়নের ফলে অর্থনৈতিক করিডোর হিসেবে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন। |
খুলনা বিভাগের ইতিহাস মূলত সুফি ঐতিহ্য, শিল্প বিপ্লব এবং স্বাধীনতার সূতিকাগারের ইতিহাস।
মৌলিক বিভাগীয় তথ্য
| বিভাগ | তথ্য |
| বিভাগীয় সদরদপ্তর | খুলনা শহর |
| জেলার সংখ্যা | ১০টি |
| আয়তন | ২২,২৭৪.৫০ বর্গকিলোমিটার |
| জনসংখ্যা (২০২৬ আনু.) | প্রায় ১৯.৫ মিলিয়ন (১ কোটি ৯৫ লক্ষ) |
| প্রধান নদীসমূহ | রূপসা, ভৈরব, পশুর, কপোতাক্ষ ও মধুমতী |
| সিটি কর্পোরেশন | ১টি (খুলনা সিটি কর্পোরেশন) |
| বিশেষ পরিচয় | সুন্দরবনের দেশ ও মোংলা বন্দরের বিভাগ |
সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থা
খুলনা বিভাগ কেন্দ্রীয় প্রশাসনের অধীনে থেকে শিল্প ও বন্দরকেন্দ্রিক বিশেষ প্রশাসনিক তদারকির মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
| পদ | বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি/সংস্থা |
| বিভাগীয় কমিশনার | অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার সিনিয়র প্রশাসনিক কর্মকর্তা |
| ডিআইজি (Range Police) | খুলনা রেঞ্জের আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা প্রধান |
| মেয়র/প্রশাসক | খুলনা সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী |
| কেডিএ (KDA) | খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (পরিকল্পিত নগরায়নের জন্য) |
প্রশাসনিক কাঠামো
খুলনা বিভাগ ১০টি প্রশাসনিক জেলা নিয়ে গঠিত, যা দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের প্রশাসনিক মেরুদণ্ড:
জেলাসমূহ : ১০টি
উপজেলা: ৫৯টি।
পৌরসভা: ৩৬টি।
ইউনিয়ন পরিষদ: ৫৭০-এর বেশি।
খুলনা বিভাগের জেলা সমূহ
খুলনা বিভাগের অন্তর্গত ১০টি জেলা:
স্থানীয় সরকার কাঠামো
বিভাগীয় কমিশনার → বিভাগের উন্নয়ন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের প্রধান সমন্বয়ক।
জেলা প্রশাসক (ডিসি) → ১০টি জেলার রাজস্ব ও সাধারণ প্রশাসনের প্রধান।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) → তৃণমূল পর্যায়ের প্রশাসনিক চালিকাশক্তি।
মোংলা পোর্ট অথরিটি → বন্দরের কার্যক্রম ও সংলগ্ন এলাকার উন্নয়নে বিশেষায়িত সংস্থা।
আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা
বিশাল বনভূমি, সীমান্ত এলাকা এবং সমুদ্রবন্দর হওয়ার কারণে এখানে নিবিড় নিরাপত্তা কাঠামো বিদ্যমান:
| সংস্থা | দায়িত্ব |
| কেএমপি (KMP) | খুলনা মহানগরীর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা |
| বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ড | মোংলা বন্দর ও বঙ্গোপসাগর উপকূলীয় নিরাপত্তা |
| বিজিবি (BGB) | যশোর, সাতক্ষীরা ও চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত সুরক্ষা |
| সুন্দরবন সুরক্ষা বাহিনী | বনদস্যু দমন ও বন্যপ্রাণী পাচার রোধ |
| র্যাব (RAB-৬) | মাদক নির্মূল ও বিশেষ অপরাধ দমন |
ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশ
অবস্থান: বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল।
সীমানা: উত্তরে রাজশাহী ও ঢাকা বিভাগ, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে বরিশাল ও ঢাকা বিভাগ এবং পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ।
ভূ-প্রকৃতি: উপকূলীয় সমভূমি ও বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের অবস্থান।
বিশেষত্ব: লোনা পানি ও মিঠা পানির মিলনস্থলে অবস্থিত হওয়ার কারণে মৎস্য সম্পদের প্রাচুর্য।
জলবায়ু: ক্রান্তীয় মৌসুমি জলবায়ু; তবে উপকূলীয় এলাকা হওয়ায় ঘূর্ণিঝড় প্রবণতা বেশি।
ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতি
| বিভাগ | তথ্য |
| প্রধান ধর্ম | ইসলাম, হিন্দু, খ্রিস্টান ও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীদের নিজস্ব ধর্ম |
| ভাষা | বাংলা (আঞ্চলিক যশোরী ও খুলনার উপভাষার প্রভাব), ইংরেজি |
| সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য | লালন গীতি, মধুসূদনের সাহিত্য, লোকজ মেলা ও সুন্দরবনের গাথা |
| উৎসব | ঈদ, পূজা, লালন স্মরণোৎসব (ছেউড়িয়া), পহেলা বৈশাখ |
অর্থনীতি ও প্রধান খাত
খুলনা বিভাগ বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি, বিশেষ করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে এর ভূমিকা অপরিসীম।
| খাত | বিবরণ |
| মৎস্য সম্পদ | দেশের প্রধান চিংড়ি উৎপাদন ও রপ্তানি কেন্দ্র (White Gold)। |
| মোংলা বন্দর | দেশের ২য় বৃহত্তম সমুদ্রবন্দর ও আমদানির প্রধান গেটওয়ে। |
| স্থলবন্দর | বেনাপোল (দেশের বৃহত্তম), ভোমরা ও দর্শনা স্থলবন্দর। |
| শিল্পায়ন | জুট মিল, নিউজপ্রিন্ট ও টেক্সটাইল খাতের ঐতিহাসিক গুরুত্ব। |
| চামড়া শিল্প | খুলনার চামড়া শিল্প অঞ্চল দেশের অন্যতম প্রধান সরবরাহকারী। |
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য
| বিভাগ | তথ্য |
| সাক্ষরতা | প্রায় ৭৮% (যশোর ও খুলনা জেলায় হার বেশি) |
| শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয় | খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (KU), কুয়েট (KUET), ইবি (IU) কুষ্টিয়া |
| মেডিকেল প্রতিষ্ঠান | খুলনা মেডিকেল কলেজ (KMC) ও যশোর মেডিকেল কলেজ |
| বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি | যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (JUST) |
| গড় আয়ু | ৭৩.৫ বছরের উপরে |
যোগাযোগ ও অবকাঠামো
আকাশপথ: যশোর বিমানবন্দর এবং প্রস্তাবিত খান জাহান আলী বিমানবন্দর।
রেলপথ: দেশের অন্যতম প্রাচীন ও উন্নত ব্রডগেজ রেল নেটওয়ার্ক (কলকাতা-ঢাকা মৈত্রী এক্সপ্রেসের রুট)।
সড়কপথ: পদ্মা সেতুর মাধ্যমে রাজধানীর সাথে দ্রুততম যোগাযোগ সংযোগ।
নৌপথ: মোংলা ও খুলনার সাথে সারা দেশের অভ্যন্তরীণ নৌ-যোগাযোগ।
পর্যটন ও ঐতিহ্য
সুন্দরবন: ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট এবং বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন।
ষাট গম্বুজ মসজিদ: খান জাহান আলী (রহ.)-এর অনন্য স্থাপত্য নিদর্শন (UNESCO সাইট)।
কুষ্টিয়া ছেউড়িয়া: লালন শাহের মাজার এবং লোকসংস্কৃতির তীর্থস্থান।
মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ: বাংলাদেশের প্রথম সরকারের শপথ গ্রহণের ঐতিহাসিক স্থান।
মধুসূদন দত্তের বাড়ি: সাগরদাঁড়ি, যশোর—বাংলা সাহিত্যের অমর কবির স্মৃতিধন্য স্থান।
আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ভূমিকা
| বিষয় | বিবরণ |
| বেনাপোল স্থলবন্দর | ভারতের সাথে স্থলপথে বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র (শতকরা ৮০ ভাগ লেনদেন)। |
| ইকোট্যুরিজম | সুন্দরবনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের প্রধান আকর্ষণ। |
| ভারত-বাংলাদেশ সংযোগ | মৈত্রী ও বন্ধন এক্সপ্রেসের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক রেল যোগাযোগ। |
| ব্লু ইকোনমি | সামুদ্রিক মৎস্য ও খনিজ সম্পদ আহরণে গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। |
সারসংক্ষেপ
খুলনা বিভাগ বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং অর্থনীতির এক সুষম মেলবন্ধন। সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সুরক্ষা আর মোংলা বন্দরের বাণিজ্যিক শক্তি খুলনাকে বিশ্বের বুকে পরিচিত করেছে। লালনের আধ্যাত্মিকতা আর শিল্পের আধুনিকতার সমন্বয়ে ২০২৬ সালে খুলনা বিভাগ একটি আধুনিক অর্থনৈতিক হাব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
নিউজ ও আর্টিকেল
মোংলা বন্দরের রেকর্ড সাফল্য: স্মার্ট লজিস্টিকস ও অটোমেশনের মাধ্যমে হ্যান্ডলিং সক্ষমতা বৃদ্ধি।
সুন্দরবন ২০২৬: বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি ও ম্যানগ্রোভ সংরক্ষণে নতুন আন্তর্জাতিক প্রজেক্ট।
চিংড়ি শিল্পের উত্তরণ: ইউরোপীয় বাজারে খুলনার চিংড়ির চাহিদা বৃদ্ধি ও মান নিয়ন্ত্রণ।
আমাদের লক্ষ্য
AFP Global Knowledge Hub–এ আমাদের লক্ষ্য হলো খুলনা বিভাগের শিল্প সম্ভাবনা, প্রাকৃতিক ঐতিহ্য এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিশ্বের সামনে নিখুঁতভাবে তুলে ধরা। আমরা তথ্যের শুদ্ধতা বজায় রেখে এই অঞ্চলের সামগ্রিক প্রোফাইল প্রদান করি।
যোগাযোগ করুন
📧 shababalsharif@gmail.com
ধন্যবাদ!
আপনি এখন বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্ত জানার যাত্রায় আছেন – আমাদের সাথেই থাকুন!
