নিয়ত কী? নিয়তের গুরুত্ব ও আমলের গ্রহণযোগ্যতা | কোরআন ও হাদিস

নিয়ত অদৃশ্য শক্তি যা আমলকে গ্রহণযোগ্য করে, কাজ নয়—নিয়তই নির্ধারণ করে আমলের মূল্য।

কেন নিয়ত ইসলামের কেন্দ্রবিন্দু

ইসলামে কাজের মূল্যায়ন বাহ্যিক আকারে নয়; অন্তরের উদ্দেশ্য দিয়ে। একই কাজ দুইজন করতে পারে—একজনেরটা ইবাদত, অন্যজনেরটা নিছক অভ্যাস। পার্থক্য কোথায়? নিয়তে। এই সত্যটিকে ইসলামের প্রাথমিক নীতিতে স্থাপন করেই হাদিসের সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ সহিহ বুখারি শুরু হয়েছে নিয়ত দিয়ে। এটি কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি ইসলামের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দর্শনের ভিত্তি

নিয়তের ভাষাগত ও শরয়ি সংজ্ঞা

ভাষাগত অর্থে নিয়ত মানে—উদ্দেশ্য, সংকল্প, মনস্থ করা। শরয়ি অর্থে নিয়ত হলো—আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো কাজ করার অন্তরের সিদ্ধান্ত। নিয়ত জিহ্বার উচ্চারণ নয়; এটি হৃদয়ের কাজ। তাই নিয়ত শুদ্ধ হলে কাজ ছোট হলেও মূল্যবান; নিয়ত দূষিত হলে বড় কাজও মূল্যহীন।

সহিহ বুখারির প্রথম হাদিস: কেন শুরু এখানেই?

রাসূল ﷺ বলেছেন— “নিশ্চয়ই সব আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল; আর প্রত্যেক মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী ফল পায়।” সহিহ বুখারি, হাদিস ১ (এটি সহিহ মুসলিমেও এসেছে) ইমাম বুখারি এই হাদিসকে প্রথমে এনে একটি নীতিগত ঘোষণা দিয়েছেন— ইসলামের সব অধ্যায় নিয়তের আলোকে পড়তে হবে।

কোরআনের আলোকে নিয়ত: আয়াতভিত্তিক বিশ্লেষণ

১) আল্লাহ অন্তরের দিকে তাকানঃ “আল্লাহ তোমাদের দেহ ও চেহারার দিকে তাকান না; বরং তোমাদের অন্তর ও আমলের দিকে তাকান।” (সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত 13) এই নীতিতে স্পষ্ট—অন্তরের উদ্দেশ্যই মূল বিচার্য

২) ইবাদতের উদ্দেশ্য একটাইঃ “তাদেরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল—আল্লাহর ইবাদত করবে, তাঁর জন্য দ্বীনকে একনিষ্ঠ করবে।” (সূরা আল-বাইয়্যিনাহ, আয়াত 5) এখানে “একনিষ্ঠ” (ইখলাস) সরাসরি নিয়তের বিশুদ্ধতা বোঝায়।

৩) দান ও কাজ—লোকদেখানো হলে মূল্যহীনঃ “হে ঈমানদারগণ! তোমরা দান করে তোমাদের দানকে নষ্ট করো না—উপকারের কথা স্মরণ করিয়ে ও কষ্ট দিয়ে।” (সূরা আল-বাকারা, আয়াত 264) লোকদেখানো (রিয়া) নিয়তকে নষ্ট করে; আমলকে শূন্য করে।

নিয়ত ও আমল: একই কাজ, ভিন্ন ফল—কেন?

একই কাজ—নামাজ, দান, শিক্ষা, ব্যবসা— কিন্তু নিয়ত ভেদে ফল ভিন্ন হয়।

  • আল্লাহর জন্য → ইবাদত

  • মানুষের প্রশংসার জন্য → রিয়া

  • নিজস্ব লাভের জন্য → দুনিয়াবি কাজ

রাসূল ﷺ বলেছেন— “অনেক রোজাদার আছে—যাদের রোজা থেকে ক্ষুধা ও তৃষ্ণা ছাড়া কিছুই লাভ হয় না।” (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস 1690) কারণ? নিয়তের ত্রুটি

নিয়ত কীভাবে আমলের বরকত বাড়ায়

নিয়ত শুদ্ধ হলে—

  • ছোট কাজও বড় ইবাদত হয়

  • ধারাবাহিকতা আসে

  • ক্লান্তি কম লাগে

  • আল্লাহর সাহায্য যুক্ত হয়

রাসূল ﷺ বলেছেন— “তোমার পরিবারে যা ব্যয় করো—তাও সদকা, যদি তা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে হয়।” (সহিহ বুখারি, হাদিস 56) অর্থাৎ দুনিয়াবি কাজও ইবাদতে পরিণত হয় নিয়তের কারণে

নিয়ত ছাড়া ইবাদত: গ্রহণযোগ্যতা বনাম আনুষ্ঠানিকতা

ইসলাম আনুষ্ঠানিক ধর্ম নয়। বাহ্যিকতা থাকলেও নিয়ত না থাকলে গ্রহণযোগ্যতা নেই। “আমি তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আল্লাহকে ভয় করি।” (সহিহ বুখারি, হাদিস 5063) এখানে রাসূল ﷺ বাহ্যিক কাজ নয়; অন্তরের ভয় ও উদ্দেশ্যকে মানদণ্ড করেছেন।

দুনিয়াবি কাজে নিয়ত: ব্যবসা, চাকরি, পরিবার

নিয়ত কেবল ইবাদতে সীমাবদ্ধ নয়।

  • ব্যবসা → হালাল উপার্জন ও মানুষের উপকারের নিয়ত

  • চাকরি → দায়িত্ব পালনের নিয়ত

  • পরিবার → দায়িত্ব ও সওয়াবের নিয়ত

“হালাল উপার্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরজ।” (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস 17419) নিয়ত যুক্ত হলে দৈনন্দিন জীবনও ইবাদত

রিয়া: নিয়তের সবচেয়ে বড় শত্রু

রিয়া মানে—আল্লাহকে নয়, মানুষকে খুশি করার উদ্দেশ্যে আমল করা। রাসূল ﷺ বলেছেন— “আমি তোমাদের ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি ভয় করি ছোট শিরকের।” জিজ্ঞেস করা হলো: ছোট শিরক কী? তিনি বললেন: “রিয়া।” (মুসনাদ আহমাদ, হাদিস 23630) রিয়া আমলকে শুধু বাতিলই করে না; আত্মিক ক্ষতিও করে

সালাফদের জীবনে নিয়তের উদাহরণ

উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) তিনি বলতেন— “আমল নিয়ত ছাড়া শরীর, আর নিয়ত আমল ছাড়া আত্মা।”

ইমাম আহমাদ তিনি বলতেন— “নিয়ত ঠিক থাকলে, অল্প আমলও পাহাড়সম।”

নিয়ত সংশোধনের বাস্তব পদ্ধতি

  1. কাজের আগে প্রশ্ন করুন: আমি কেন করছি?

  2. প্রশংসা এলে অন্তরে আল্লাহকে স্মরণ করুন

  3. গোপন আমল বাড়ান

  4. দোয়া করুন—নিয়ত শুদ্ধ রাখার জন্য

  5. ফল নয়, দায়িত্বে মনোযোগ দিন

রাসূল ﷺ দোয়া করতেন— “হে আল্লাহ! আমার অন্তরকে শুদ্ধ করে দিন।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস 2864)

নিয়ত—অদৃশ্য কিন্তু নির্ধারক শক্তি

নিয়ত দেখা যায় না; কিন্তু সবকিছু নির্ধারণ করে। কাজের সংখ্যা নয়—কাজের উদ্দেশ্যই ইসলামে চূড়ান্ত মানদণ্ড। এই কারণেই ইসলামের শুরু নিয়ত দিয়ে— আর প্রত্যেক মুসলমানের শুরু হওয়া উচিত নিজের অন্তর দেখার মাধ্যমে

শেষ কথা

এই লেখা কাউকে বিচার করার জন্য নয়; এটি নিজেকে যাচাই করার জন্য। কারণ— নিয়ত শুদ্ধ হলে পথ সহজ হয়, আর নিয়ত নষ্ট হলে পথ হারিয়ে যায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *