শ্রীপুর উপজেলা

শিল্পায়নের মেগা হাব, সবুজের সমারোহ এবং পর্যটনের আধুনিক গন্তব্য

শ্রীপুর উপজেলা ঢাকা বিভাগের গাজীপুর জেলার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং দ্রুত বর্ধনশীল প্রশাসনিক অঞ্চল। রাজধানী ঢাকার উত্তর দিকে এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ওপর অবস্থিত এই জনপদটি বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। একদিকে কয়েক হাজার পোশাক কারখানা ও ভারি শিল্প, অন্যদিকে বিশাল শালবন ও আধুনিক রিসোর্ট—শ্রীপুরকে দিয়েছে এক অনন্য স্বকীয়তা। ২০২৬ সালের এই সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কের আধুনিকায়ন এবং ‘স্মার্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন’ হিসেবে শ্রীপুর এখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এক বিশেষ পরিচিতি বহন করে।


রাষ্ট্র গঠন ও ঐতিহাসিক পটভূমি

শ্রীপুরের ইতিহাস প্রাচীন ভাওয়াল পরগনার ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে। মোগল ও ব্রিটিশ আমল থেকেই এই অঞ্চলটি বনজ সম্পদ ও নীল চাষের জন্য পরিচিত ছিল। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে শ্রীপুরের বীর জনতা অসামান্য অবদান রাখেন।

সংক্ষিপ্ত ঐতিহাসিক ধারা

সময়কালগুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ঘটনা
প্রাচীন ও মধ্যযুগপ্রাচীন ভাওয়াল স্টেটের অংশ। এখানকার মাওনা এলাকাটি ঐতিহাসিকভাবেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল।
১৯৩৩ব্রিটিশ শাসন আমলে শ্রীপুর থানা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
১৯৭১মহান মুক্তিযুদ্ধে শ্রীপুর ছিল ৩ নম্বর সেক্টরের অধীনে। শ্রীপুর রেলওয়ে স্টেশনের সম্মুখ যুদ্ধ এই অঞ্চলের অন্যতম বীরত্বগাথা।
১৯৮৩১ ডিসেম্বর শ্রীপুর থানাকে পূর্ণাঙ্গ উপজেলায় উন্নীত করা হয়।
বর্তমান (২০২৬)ডিজিটাল লজিস্টিক করিডোর এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের কেন্দ্র।

শ্রীপুরের ইতিহাস মূলত শালবনের শৌর্য, মাওনার কর্মচঞ্চলতা আর আধুনিক শিল্প বিপ্লবের এক সফল গাথা।


মৌলিক উপজেলা তথ্য

বিভাগতথ্য
জেলা ও বিভাগগাজীপুর জেলা, ঢাকা বিভাগ
পৌরসভা১টি (শ্রীপুর পৌরসভা)
ইউনিয়ন সংখ্যা৮টি
আয়তন৪৬৯.২৪ বর্গকিলোমিটার
জনসংখ্যা (২০২৬ আনু.)প্রায় ৮.৫ লক্ষ (শিল্প শ্রমিক ও ভাসমান জনসংখ্যাসহ)
প্রধান নদীসমূহশীতলক্ষ্যা ও বানার
বিশেষ পরিচয়সাফারি পার্কের শহর ও শিল্পের রাজধানী

সরকার ও রাষ্ট্রব্যবস্থা

শ্রীপুর উপজেলা প্রশাসন বর্তমানে শিল্প নিরাপত্তা এবং বনাঞ্চল সংরক্ষণে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করে।

পদবর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি/সংস্থা
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)প্রশাসনিক ও উন্নয়ন প্রকল্পের প্রধান তদারককারী
উপজেলা চেয়ারম্যানস্থানীয় সরকারের নির্বাচিত প্রধান
পৌর মেয়র/প্রশাসকশ্রীপুর পৌরসভার প্রধান নির্বাহী
বিজিএমইএ/বিকেএমইএস্থানীয় শিল্প মালিকদের বাণিজ্যিক প্রতিনিধি সংস্থা

প্রশাসনিক কাঠামো

শ্রীপুর উপজেলা ১টি সমৃদ্ধ পৌরসভা এবং ৮টি অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ ও শিল্প-সমৃদ্ধ ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত:

  • ইউনিয়নসমূহ : ৮টি

  • পৌরসভা: শ্রীপুর পৌরসভা।

শ্রীপুর উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদ সমূহ

শ্রীপুর উপজেলা গঠিত ৮টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা নিয়ে। এখানে একটি প্রধান থানা রয়েছে।

ইউনিয়নসমূহ:

১। বরমী

২। গাজীপুর

৩। গোসিংগা

৪। মাওনা

৫। কাওরাইদ

৬। প্রহলাদপুর

৭। রাজাবাড়ী

৮। তেলিহাটী


স্থানীয় সরকার কাঠামো

  • উপজেলা পরিষদ → শিল্প ও গ্রামীণ উন্নয়নের সমন্বয়ক।

  • পৌরসভা → নগর উন্নয়ন, স্মার্ট ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা।

  • বন বিভাগ → ভাওয়াল ও শ্রীপুর শালবন এবং সাফারি পার্ক তদারকি।

  • বেজা (BEZA) → পরিকল্পিত শিল্প জোনের বিনিয়োগ সমন্বয়।


আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা

বিশাল শিল্পাঞ্চল এবং জাতীয় মহাসড়কের নিরাপত্তার কারণে এখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত আধুনিক:

সংস্থাদায়িত্ব
শ্রীপুর থানা পুলিশঅভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা রক্ষা
ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশমাওনা ও এমসি বাজার এলাকার গার্মেন্টস ও কারখানার নিরাপত্তা
হাইওয়ে পুলিশঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ট্রাফিক ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ
ট্যুরিস্ট পুলিশসাফারি পার্ক ও রিসোর্ট এলাকায় পর্যটকদের নিরাপত্তা

ভৌগোলিক অবস্থান ও পরিবেশ

  • অবস্থান: গাজীপুর জেলার উত্তরাঞ্চল।

  • সীমানা: উত্তরে ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও ও ভালুকা, দক্ষিণে গাজীপুর সদর ও কালীগঞ্জ, পূর্বে কাপাসিয়া এবং পশ্চিমে কালিয়াকৈর উপজেলা।

  • ভূ-প্রকৃতি: লাল মাটির উঁচু ভূমি এবং বিস্তীর্ণ শালবন সমৃদ্ধ।

  • বিশেষত্ব: শীতলক্ষ্যা নদী—যা বরমী ও গোসিংগা ইউনিয়নের ওপর দিয়ে প্রবাহিত।

  • জলবায়ু: মনোরম ও নাতিশীতোষ্ণ; প্রচুর অরণ্যের কারণে এখানে ঢাকার চেয়ে তাপমাত্রা কিছুটা কম থাকে।


ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতি

বিভাগতথ্য
প্রধান ধর্মইসলাম ও হিন্দু (ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী বর্মণ ও আদিবাসীদের উপস্থিতি রয়েছে)
ভাষাবাংলা (আঞ্চলিক ঢাকার টান এবং প্রমিত বাংলার সংমিশ্রণ)
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকাওরাইদের বারুণী মেলা, বরমীর চৈত্র সংক্রান্তি ও লোকজ গান
ঐতিহ্যবাহী খাবারবরমীর মিষ্টি, নদীর তাজা মাছ এবং বনের মধু
উৎসবঈদ, পূজা, পৌষ সংক্রান্তি ও সাফারি পার্কের পর্যটন উৎসব

অর্থনীতি ও প্রধান খাত

শ্রীপুর বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড এগ্রো-ফার্মিং হাব’

খাতবিবরণ
তৈরি পোশাক শিল্পমাওনা ও তেলিহাটি অঞ্চলে কয়েক হাজার সোয়েটার ও গার্মেন্টস কারখানার অবস্থান।
সিরামিক ও ভারি শিল্পদেশের শীর্ষস্থানীয় সিরামিক ও গ্লাস কারখানার মেগা প্ল্যান্ট এখানে অবস্থিত।
পোল্ট্রি ও ডেইরিবাংলাদেশের পোল্ট্রি শিল্পের ‘পাওয়ার হাউস’; শত শত বাণিজ্যিক খামার।
পর্যটন শিল্পসাফারি পার্ক ও অর্ধশতাধিক আধুনিক রিসোর্ট থেকে বিপুল রাজস্ব আয়।

শিক্ষা ও স্বাস্থ্য

বিভাগতথ্য
সাক্ষরতাপ্রায় ৭৮% (উর্ধমুখী)
শীর্ষ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানশ্রীপুর সরকারি কলেজ ও মাওনা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়
মেডিকেল প্রতিষ্ঠান১০০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক উপজেলা হাসপাতাল ও উন্নত বেসরকারি ট্রমা সেন্টার
কারিগরী শিক্ষাশ্রীপুর টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ
গড় আয়ু৭৪ বছরের উপরে

যোগাযোগ ও অবকাঠামো

  • সড়কপথ: ঢাকা-ময়মনসিংহ ৮ লেনের মহাসড়ক শ্রীপুরকে রাজধানীর সাথে অত্যন্ত দ্রুততম যাতায়াতে সংযুক্ত করেছে। মাওনা চৌরাস্তা হলো এই রুটের অন্যতম ব্যস্ত জংশন।

  • রেলপথ: শ্রীপুর ও কাওরাইদ রেলওয়ে স্টেশন—যা ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটের গুরুত্বপূর্ণ বিরতিস্থল।

  • ডিজিটাল: ৫জি কানেক্টিভিটি এবং শিল্প এলাকায় স্মার্ট লজিস্টিক সুবিধা।

  • সেতু: শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর আধুনিক সেতু যা কাপাসিয়ার সাথে সংযোগ নিশ্চিত করেছে।


পর্যটন ও ঐতিহ্য

  • বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক: দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম আধুনিক সাফারি পার্ক এবং শ্রীপুরের প্রধান আকর্ষণ।

  • রিসোর্ট জোন: সারাহ্ রিসোর্ট, গ্রিন ভিউ ও ড্রিম হলিডের মতো অত্যাধুনিক পর্যটন কেন্দ্র।

  • বরমী বাজার: শীতলক্ষ্যা তীরের প্রাচীনতম ও ঐতিহাসিক বাণিজ্য কেন্দ্র।

  • কাওরাইদ আশ্রম ও মেলা: ঐতিহাসিক ও আধ্যাত্মিক গুরুত্বসম্পন্ন স্থান।

  • শালবন: প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা বিশাল বনাঞ্চল যা ইকো-ট্যুরিজমের জন্য বিখ্যাত।


আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ভূমিকা

বিষয়বিবরণ
রপ্তানি বাণিজ্যশ্রীপুরের কারখানায় উৎপাদিত পোশাক ও সিরামিক বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিং করছে।
পর্যটন আকর্ষণসাফারি পার্কের কারণে বিদেশি পর্যটক ও বিজ্ঞানীদের গবেষণার অন্যতম কেন্দ্র।
খাদ্য নিরাপত্তাপোল্ট্রি ও ডেইরি শিল্পের মাধ্যমে রাজধানী ঢাকার প্রোটিন চাহিদার বড় অংশ শ্রীপুর থেকে আসে।

সারসংক্ষেপ

শ্রীপুর উপজেলা ঐতিহ্যের আভিজাত্য আর আধুনিক গতির এক অনবদ্য প্রতিচ্ছবি। শালবনের স্নিগ্ধতা আর মাওনা চৌরাস্তার কর্মচাঞ্চল্য এই অঞ্চলকে এক বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে। সাফারি পার্কের বন্যপ্রাণীর মায়া আর হাজারো কারখানার চাকা শ্রীপুরকে ২০২৬ সালের এই সময়ে বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী ‘স্মার্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল ও ট্যুরিজম সিটি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অরণ্যের মমতা আর আধুনিক প্রযুক্তির সফলতায় শ্রীপুর এখন স্মার্ট বাংলাদেশের এক অপরিহার্য ও প্রভাবশালী চালিকাশক্তি।


নিউজ ও আর্টিকেল

  • স্মার্ট সাফারি পার্ক ২০২৬: সাফারি পার্কে এআই (AI) চালিত ট্র্যাকিং এবং ডিজিটাল টিকিটিং সিস্টেমের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন।

  • মাওনা স্মার্ট করিডোর: মাওনা চৌরাস্তায় নতুন দৃষ্টিনন্দন ফ্লাইওভার ও স্মার্ট ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থার উদ্বোধন।

  • পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন: শ্রীপুরের ৫০০টি শিল্প কারখানায় জিরো ডিসচার্জ ইটিপি (ETP) প্ল্যান্ট স্থাপনের রেকর্ড অর্জন।


আমাদের লক্ষ্য

AFP Global Knowledge Hub–এ আমাদের লক্ষ্য হলো শ্রীপুর উপজেলার নির্ভুল ইতিহাস, অর্থনৈতিক শৌর্য এবং পর্যটন মহিমা বিশ্বের সামনে তুলে ধরা। আমরা তথ্যের শুদ্ধতা বজায় রেখে এই অঞ্চলের সামগ্রিক প্রোফাইল প্রদান করি।


যোগাযোগ করুন

এই প্রোফাইলে কোনো আপডেট/সংশোধন/নতুন তথ্য যোগ করতে চাইলে আমাদের সম্পাদকীয় টিমকে বার্তা দিন। আপনার অংশগ্রহণই আমাদের এই তথ্যভান্ডারকে সমৃদ্ধ করে তুলবে।

📧 shababalsharif@gmail.com
🌐 https://shababalsharif.com


ধন্যবাদ!
আপনি এখন বাংলাদেশের প্রতিটি প্রান্ত জানার যাত্রায় আছেন – আমাদের সাথেই থাকুন!