“সার্বভৌম রাষ্ট্র” (Sovereign State) হল এমন একটি রাষ্ট্র যার ওপর অন্য কোনো রাষ্ট্র বা সংস্থা কর্তৃত্ব প্রয়োগ করতে পারে না। এটি রাজনৈতিক স্বাধীনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মাধ্যমে চিহ্নিত হয়। সার্বভৌমত্ব একটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ অধিকার এবং নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের অন্যতম ভিত্তি।
সার্বভৌম রাষ্ট্রের সংজ্ঞা
সার্বভৌমত্ব অর্থ হলো নিজস্ব আইনি, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে পূর্ণ স্বাধীনতা। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র সেই রাষ্ট্র যা—
নিজস্ব সংবিধান ও আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়
বাহ্যিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণ করতে পারে
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত
আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সম্পর্ক গড়ে তুলতে সক্ষম
সূত্র:
Jean Bodin, Six Books of the Commonwealth (1576) – আধুনিক সার্বভৌমত্ব তত্ত্বের প্রবর্তক।
Montevideo Convention (1933)
সার্বভৌম রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্ট্য
| বৈশিষ্ট্য | ব্যাখ্যা |
|---|---|
| আইন প্রণয়নের ক্ষমতা | নিজস্ব আইন তৈরি ও বাস্তবায়ন করতে পারে |
| সার্বভৌম কর্তৃত্ব | কোন বিদেশি শক্তির অধীন নয় |
| আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি | অন্যান্য রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সংস্থার স্বীকৃতি প্রাপ্ত |
| রাজনৈতিক স্বনির্ভরতা | নিজের ভবিষ্যৎ নিজেরাই নির্ধারণ করে |
ইতিহাসে সার্বভৌমত্বের ধারণার বিকাশ
প্রাচীন ধারণা:
ভারতীয় রাষ্ট্রতন্ত্রে “ধর্ম ও রাজা”র মাধ্যমে প্রশাসন চালিত হতো, তবে তা সর্বময় ছিল না।
গ্রিক ও রোমান সভ্যতায় সার্বভৌম ক্ষমতা ছিল নির্বাচিত কিংবা সম্রাটের হাতে।
আধুনিক যুগ:
১৬৪৮ সালের Westphalia চুক্তি আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করে, যেখানে সার্বভৌমত্বের ধারণা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায়।
ঔপনিবেশিক যুগ ও স্বাধীনতা আন্দোলন:
বহু রাষ্ট্র উপনিবেশ থেকে মুক্ত হয়ে সার্বভৌমতা অর্জন করে, যেমন ভারত (১৯৪৭), বাংলাদেশ (১৯৭১)।
আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র
জাতিসংঘ সনদের ২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী:
“The Organization is based on the principle of the sovereign equality of all its Members.”
এতে বলা হয়েছে, সকল রাষ্ট্র সমান মর্যাদা সম্পন্ন এবং প্রত্যেকের সার্বভৌমত্ব আন্তর্জাতিকভাবে মান্য।
সার্বভৌম রাষ্ট্র বনাম অনানুষ্ঠানিক অঞ্চল
| ধরণ | উদাহরণ | বৈশিষ্ট্য |
|---|---|---|
| সার্বভৌম রাষ্ট্র | বাংলাদেশ, জাপান, ফ্রান্স | পূর্ণ স্বীকৃতি ও স্বাধীনতা |
| বিতর্কিত অঞ্চল | প্যালেস্টাইন, কসোভো | কিছু রাষ্ট্র স্বীকৃতি দিলেও সবার নয় |
| স্ব-ঘোষিত রাষ্ট্র | নাগোর্নো-কারাবাখ, ট্রান্সনিস্ট্রিয়া | আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নেই |
আধুনিক বিশ্বের চ্যালেঞ্জ
আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ – বড় শক্তির সামরিক বা অর্থনৈতিক চাপ (যেমন: ইউক্রেন সংকট)
বিচ্ছিন্নতাবাদ – অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীগুলোর স্বাধীনতার দাবি (যেমন: কাতালোনিয়া, কুর্দিস্তান)
গ্লোবাল গভর্নেন্স বনাম জাতীয় সার্বভৌমত্ব – WHO, IMF, WTO ইত্যাদির প্রভাব
সাইবার সার্বভৌমত্ব – ইন্টারনেট ও তথ্যের নিয়ন্ত্রণ
সার্বভৌম রাষ্ট্র একটি জাতির রাজনৈতিক পরিচয় ও স্বাধীনতার বহিঃপ্রকাশ। এটি শুধু সীমান্তে সীমাবদ্ধ নয়, বরং জনগণের মর্যাদা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আন্তর্জাতিক অবস্থানের প্রতিচ্ছবি। তথ্যযুগে সার্বভৌমত্বের ধারণা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়লেও এর মৌলিক গুরুত্ব অপরিবর্তিত।
রেফারেন্স:
Jean Bodin – Six Books of the Commonwealth, 1576
Montevideo Convention, 1933
Charter of the United Nations, Article 2(1), 1945
Malcolm Shaw – International Law, Cambridge University Press



