পবিত্র কুরআনের ১১৪টি সূরার মধ্যে ১১৩টি সূরাই শুরু হয়েছে “বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম” দিয়ে। এটি কেবল একটি বাক্য নয়, বরং এটি মুমিনের জীবনের রক্ষাকবচ এবং প্রতিটি নেক কাজের মূল ভিত্তি। আজকের নিবন্ধে আমরা কুরআন, হাদিস এবং বরেণ্য মুফাসসিরদের মতামতের আলোকে এর গভীরতা বিশ্লেষণ করব।
বিসমিল্লাহর শাব্দিক ও পারিভাষিক অর্থ
“বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম” বাক্যটিতে মূলত মহান আল্লাহর তিনটি বিশেষ গুণবাচক নাম ও তাঁর ক্ষমতার ঘোষণা রয়েছে।
বিসমিল্লাহ (আল্লাহর নামে): এখানে ‘বা’ অব্যয়টি সাহায্য প্রার্থনা ও বরকতের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ, “আমি আল্লাহর সাহায্য ও বরকত নিয়ে শুরু করছি।”
আর-রাহমান (পরম করুণাময়): এটি আল্লাহর এমন একটি গুণ যা সৃষ্টির সবার জন্য অবারিত। তিনি মুসলিম, অমুসলিম, পশুপাখি—সবাইকে এই গুণের মাধ্যমে রিজিক ও দয়া দান করেন।
আর-রাহিম (অত্যন্ত দয়ালু): এই গুণটি বিশেষভাবে মুমিনদের জন্য নির্দিষ্ট, যার পূর্ণ প্রকাশ ঘটবে পরকালে।
সারার্থ: পরম করুণাময় ও অতি দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু করছি।
বিসমিল্লাহ নাযিলের প্রেক্ষাপট ও ঐতিহাসিক ইতিহাস
ইসলামিক ইতিহাস ও তাফসীর গ্রন্থ (যেমন: তাফসীরে ইবনে কাসীর) অনুযায়ী, জাহেলিয়াত যুগে আরবরা তাদের দেব-দেবীর নামে কাজ শুরু করত। রাসূলুল্লাহ (সা.) নবুওয়াত প্রাপ্তির পর প্রথম দিকে ‘বিসমিকাল্লাহুম্মা’ লিখতেন। কিন্তু যখন সূরা হুদের ৪১ নম্বর আয়াত (بِسْمِ اللَّهِ مَجْرَاهَا) এবং সূরা ইসরা-র ১১০ নম্বর আয়াত নাযিল হলো, তখন তিনি ‘বিসমিল্লাহ’ লিখতে শুরু করেন।
পরবর্তীতে যখন সূরা নামল-এর ৩০ নম্বর আয়াত (إِنَّهُ مِن سُلَيْمَانَ وَإِنَّهُ بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَٰنِ الرَّحِيمِ) নাযিল হলো, তখন থেকে পূর্ণাঙ্গ “বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম” লেখার নিয়ম স্থায়ী হয়। এটি মূলত হযরত সুলাইমান (আ.)-এর চিঠির মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করে এবং আমাদের শরীয়তে প্রতিটি কাজের শুরুতে এটি পাঠ করা সুন্নাত হিসেবে সাব্যস্ত হয়।
বিসমিল্লাহর গুরুত্ব ও ফজিলত: হাদিসের আলোকে
পবিত্র হাদিস শরিফে এই বাক্যের অসংখ্য ফজিলত বর্ণিত হয়েছে:
১. কাজে বরকত লাভ: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে কাজ বিসমিল্লাহ ছাড়া শুরু করা হয়, তা বরকতহীন বা লেজকাটা।” (ইবনে মাজাহ)। ২. শয়তানের প্রভাব থেকে মুক্তি: খাবারের শুরুতে বা ঘরে প্রবেশের সময় বিসমিল্লাহ পাঠ করলে শয়তান সেখানে অবস্থান করার সুযোগ পায় না (সহীহ মুসলিম)। ৩. বিপদে নিরাপত্তা: হযরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যখন তুমি কোনো বিপদে পড়বে তখন বলো—বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম…। এর বরকতে আল্লাহ তাআলা বিপদ-আপদ কাটিয়ে দেবেন।”
ইসলামিক তাফসির ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা
বিখ্যাত মুফাসসিরগণ এই আয়াতের গভীর আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন:
তাফসীরে মাআরিফুল কুরআন: এখানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, মানুষ যখন বিসমিল্লাহ বলে কোনো কাজ শুরু করে, তখন সে কার্যত স্বীকার করে নেয় যে—নিজের শক্তিতে সে কিছুই করার ক্ষমতা রাখে না, বরং আল্লাহর দয়াতেই সে সফল হবে।
ইমাম রাযী (রহ.)-এর মতে: বিসমিল্লাহ পাঠ করার অর্থ হলো আল্লাহর সাথে একটি চুক্তি করা যে, আমি আপনার নাম নিয়ে কাজ শুরু করছি, সুতরাং আপনি আমাকে শয়তানের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করুন।
প্রাত্যহিক জীবনে বিসমিল্লাহর ব্যবহারিক ক্ষেত্র
একজন মুমিনের জন্য নিচের ক্ষেত্রগুলোতে বিসমিল্লাহ বলা অত্যন্ত জরুরি:
ওজু করার শুরুতে।
খাবার গ্রহণের সময়।
ঘর থেকে বের হওয়ার সময় বা ঘরে প্রবেশের সময়।
যৌন মিলনের পূর্বে (শয়তানের প্রভাব থেকে সন্তানকে রক্ষা করতে)।
যানবাহনে ওঠার সময়।
“বিসমিল্লাহির রহমানির রহিম” কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি আল্লাহর প্রতি পরম আনুগত্যের প্রকাশ। এটি আমাদের অহংকার চূর্ণ করে এবং স্মরণ করিয়ে দেয় যে আমরা প্রতিটি পদক্ষেপে আমাদের রবের মুখাপেক্ষী। তাই আমাদের উচিত ছোট-বড় প্রতিটি নেক কাজের শুরুতে এই পবিত্র বাক্যটি পাঠ করে মহান আল্লাহর অশেষ রহমত ও বরকত হাসিল করা।


