ইসলামে ঈমান বা বিশ্বাসের গুরুত্ব অপরিসীম। ঈমান কেবল মুখে স্বীকার করার নাম নয়, বরং এটি অন্তরের বিশ্বাস, মুখের স্বীকৃতি এবং কর্মের সমন্বয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈমানের পূর্ণাঙ্গ রূপ বোঝাতে এর বিভিন্ন শাখার কথা উল্লেখ করেছেন। আজ আমরা সহিহ হাদিসের আলোকে ঈমানের ৭৭টি শাখা বা ‘শুআবুল ঈমান’ সম্পর্কে বিস্তারিত জানব।
ঈমানের শাখা সম্পর্কে সহিহ হাদিস
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন:
“ঈমানের সত্তরেরও বেশি শাখা রয়েছে। তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই) বলা। আর সর্বনিম্ন শাখা হলো রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা। আর লজ্জা হলো ঈমানের একটি বিশেষ শাখা।” (সহিহ বুখারী ও মুসলিম)
বিখ্যাত আলেমগণ কুরআন ও সুন্নাহর গবেষণার মাধ্যমে ঈমানের এই শাখাগুলোকে তিনটি প্রধান ভাগে ভাগ করেছেন: ১. অন্তরের সাথে সংশ্লিষ্ট (বিশ্বাস) ২. জিহ্বার সাথে সংশ্লিষ্ট (মুখের স্বীকৃতি) ৩. অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সাথে সংশ্লিষ্ট (কাজকর্ম)
ঈমানের ৭৭টি শাখার বিস্তারিত তালিকা
নিচে ঈমানের ৭৭টি শাখাকে তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে উপস্থাপন করা হলো:
১. অন্তরের সাথে সংশ্লিষ্ট শাখা (৩০টি)
ঈমানের মূল ভিত্তি হলো অন্তরের বিশ্বাস। এই ৩০টি শাখা সরাসরি আমাদের আকিদা বা বিশ্বাসের সাথে যুক্ত:
আল্লাহ তাআলার ওপর বিশ্বাস স্থাপন।
আল্লাহ ছাড়া অন্য সবকিছু নশ্বর বা সৃষ্টি—এ বিশ্বাস রাখা।
ফেরেশতাদের ওপর বিশ্বাস।
আসমানি কিতাবসমূহের ওপর বিশ্বাস।
নবী-রাসুলগণের ওপর বিশ্বাস।
তাকদির বা ভালো-মন্দের ওপর বিশ্বাস।
পরকাল বা কিয়ামতের ওপর বিশ্বাস।
জান্নাতের ওপর বিশ্বাস।
জাহান্নামের ওপর বিশ্বাস।
আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা রাখা।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা।
আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কাউকে ভালোবাসা বা ঘৃণা করা।
ইখলাস বা সব কাজে একনিষ্ঠতা।
গুনাহর জন্য অনুতপ্ত হয়ে তওবা করা।
আল্লাহর ভয় অন্তরে রাখা।
আল্লাহর রহমতের আশা রাখা।
লজ্জাশীলতা বজায় রাখা।
আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা।
ওয়াদা বা প্রতিশ্রুতি পূরণ করা।
বিপদে সবর বা ধৈর্য ধারণ করা।
বিনয়ী হওয়া এবং অহংকার ত্যাগ করা।
সৃষ্টির প্রতি দয়া ও মমতা প্রদর্শন।
আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা (রেজা বিল কাজা)।
আল্লাহর ওপর ভরসা (তাওয়াক্কুল) করা।
আত্মতুষ্টি বা রিয়া (লোক দেখানো ইবাদত) বর্জন করা।
হিংসা ও বিদ্বেষ ত্যাগ করা।
ক্রোধ বা রাগ নিয়ন্ত্রণ করা।
কারও অকল্যাণ কামনা না করা।
দুনিয়ার মোহ ত্যাগ করা।
২. জিহ্বার সাথে সংশ্লিষ্ট শাখা (৭টি)
মুখের মাধ্যমে আমরা যে ইবাদতগুলো করি তা এই শাখার অন্তর্ভুক্ত:
কালিমায়ে তায়্যিবা পাঠ করা।
পবিত্র কুরআন তিলাওয়াত করা।
দ্বীনি ইলম বা জ্ঞান অর্জন ও শিক্ষা দেওয়া।
আল্লাহর জিকির ও তাসবিহ পাঠ করা।
দোয়া ও মোনাজাত করা।
অসার বা ফালতু কথা পরিহার করা।
সালাম আদান-প্রদান করা।
৩. অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সাথে সংশ্লিষ্ট শাখা (৪০টি)
আমাদের দৈনন্দিন কাজ ও ইবাদতের মাধ্যমে এই শাখাগুলো পূর্ণ হয়:
পবিত্রতা অর্জন (ওজু, গোসল)।
সালাত বা নামাজ কায়েম করা।
জাকাত প্রদান করা।
সাওম বা রোজা রাখা।
হজ পালন করা।
ইতিকাফ করা।
হিজরত করা (প্রয়োজনবোধে)।
মানত পূরণ করা।
কসমের কাফফারা আদায় করা।
শরীরের পর্দা বজায় রাখা।
কোরবানি করা।
মৃত ব্যক্তির কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করা।
পিতা-মাতার অবাধ্য না হওয়া এবং তাদের সেবা করা।
আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা।
সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করা।
শাসকের আনুগত্য করা (শরীয়ত বিরোধী নয় এমন কাজে)।
বিবাদমান মানুষের মধ্যে মীমাংসা করা।
প্রতিবেশীর হক আদায় করা।
আমানত রক্ষা করা।
ঋণ পরিশোধ করা।
মেহমানদারি করা।
মানুষের দোষ গোপন রাখা।
রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা।
পরিমাপে কম না দেওয়া।
(দ্রষ্টব্য: এটি একটি সংক্ষিপ্ত সারসংক্ষেপ। বিস্তারিত ব্যাখ্যায় প্রতিটি শাখার গভীরে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে।)
কেন ঈমানের ৭৭টি শাখা জানা জরুরি?
ঈমানের এই শাখাগুলো মূলত একজন মুমিনের পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। যখন একজন মুসলিম তার জীবনে এই ৭৭টি গুণের চর্চা করে, তখন তার ঈমান পূর্ণতা পায়। এটি কেবল আধ্যাত্মিক উন্নয়ন নয়, বরং একটি সুন্দর সমাজ গঠনেরও মূল ভিত্তি।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
প্রশ্ন ১: ঈমানের সবচেয়ে বড় শাখা কোনটি?
উত্তর: ঈমানের প্রধান ও শ্রেষ্ঠ শাখা হলো ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই—এই একত্ববাদের ঘোষণা।
প্রশ্ন ২: ঈমানের শাখাগুলো কি কুরআন ও হাদিস দ্বারা প্রমাণিত?
উত্তর: হ্যাঁ, ইমাম বায়হাকী (রহ.) সহ অনেক প্রখ্যাত আলেম কুরআন ও সহিহ হাদিসের রেফারেন্স দিয়ে এই শাখাগুলোকে সংকলিত করেছেন।
আপনার জীবনকে ইসলামের আলোয় আলোকিত করতে এবং আরও ইসলামিক আর্টিকেল পড়তে আমাদের সাথেই থাকুন। শেয়ার করে অন্যদেরও জানার সুযোগ করে দিন।

