পৃথিবীর বুকে কিছু প্রতীক রহস্য হয়ে বেঁচে থাকে। পেরুর দক্ষিণাঞ্চলের নাস্কা মরুভূমিতে আঁকা নাস্কা লাইন্স তারই একটি উদাহরণ। শত শত মিটার দীর্ঘ এই বিশাল আকারের জিওগ্লিফ (মাটিতে আঁকা ছবি) আজও গবেষকদের অবাক করে দেয়।
কেন এই রেখাচিত্র আঁকা হয়েছিল?
কে বা কারা এটি নির্মাণ করেছিল?
আর এর প্রকৃত উদ্দেশ্যই বা কী ছিল?
নাস্কা লাইন্স কী?
নাস্কা লাইন্স হল বিশাল আকৃতির রেখা, আকৃতি ও প্রতীক, যেগুলি নাস্কা ও পাম্পা মরুভূমির উপর খোদাই করা হয়েছে। এগুলির মধ্যে রয়েছে:
সরলরেখা
ত্রিভুজ, ট্রাপেজিয়াম ও সর্পিলাকৃতি নকশা
এবং বহু প্রাণীর প্রতিচ্ছবি: বানর, মাকড়সা, কন্ডর, হুমিংবার্ড, তিমি, কুকুর ইত্যাদি।
এই চিত্রগুলো এতই বড় যে কেবল উপর থেকে বা বিমানে চড়া অবস্থায় বোঝা যায় এগুলোর পূর্ণাঙ্গতা।
নির্মাণকাল ও প্রযুক্তি
গবেষকদের মতে, নাস্কা লাইন্স মূলত খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ থেকে খ্রিস্টীয় ৫০০ সালের মধ্যে নাস্কা সভ্যতার মানুষরা তৈরি করেছে।
প্রযুক্তিগতভাবে, তারা শুষ্ক ভূমির উপর গাঢ় স্তরের পাথর সরিয়ে হালকা বালির অংশ উন্মুক্ত করে রেখাগুলি তৈরি করেছিল—একটি চমৎকার উদাহরণ প্রাচীন মানুষের জ্যামিতিক জ্ঞান ও পরিকল্পনার।
উদ্দেশ্য ও ব্যাখ্যা
এখনও পর্যন্ত নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারেনি, এগুলো কেন নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে প্রধান কিছু মতবাদ হলো:
ধর্মীয় উদ্দেশ্য: দেবতাদের উদ্দেশে প্রার্থনা বা উৎসর্গ।
জ্যোতির্বিদ্যা সংক্রান্ত: নক্ষত্র ও সূর্যের গতিপথ চিহ্নিত করার জন্য।
জল প্রার্থনা: মরুভূমিতে বৃষ্টির আশায় আকাশদেবতাদের আহ্বান।
পার্থিব ও অপার্থিব যোগাযোগ: কেউ কেউ মনে করেন এগুলো “ভিনগ্রহবাসীদের জন্য রানওয়ে!”
(Reference: Erich von Däniken, Chariots of the Gods, 1968)
আধুনিক গবেষণা ও প্রযুক্তি
NASA এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় আধুনিক প্রযুক্তি যেমন:
সেটেলাইট ইমেজিং
ড্রোন ম্যাপিং
LiDAR স্ক্যানিং
ব্যবহার করে নাস্কা লাইন্সের আরো নতুন চিত্র আবিষ্কার করেছে।
2019 সালে জাপানিজ গবেষকেরা নতুন ১৪৩টি প্রতিচ্ছবি শনাক্ত করেন, যা আগে দেখা যায়নি।
(Reference: Yamagata University, Nazca Project, 2019)
UNESCO স্বীকৃতি ও সংরক্ষণ
১৯৯৪ সালে UNESCO নাস্কা লাইন্সকে World Heritage Site হিসেবে ঘোষণা করে।
তবে জলবায়ু পরিবর্তন, অজান্তে চলাচল এবং অবৈধ খনন আজ এই মহামূল্য সম্পদকে হুমকির মুখে ফেলছে।
উপসংহার
নাস্কা লাইন্স হলো প্রাচীন মানুষের অদম্য সৃজনশক্তি ও বিশ্বাসের নিদর্শন।
এই রেখাগুলোর মানে আমরা হয়তো আজও পুরোপুরি বুঝতে পারিনি, কিন্তু এটি নিশ্চিত যে—মানুষের চিন্তা ও কল্পনার ক্ষমতা অসীম।
রেফারেন্স
Reiche, M. (1949). Mystery on the Desert
Däniken, E. V. (1968). Chariots of the Gods
UNESCO World Heritage Centre
Yamagata University Nazca Research Reports (2019)
National Geographic, “Secrets of the Nazca Lines”

